ব্রেকিং নিউজঃ
Home / ফিচার / হাজীগঞ্জ দুর্গ: ত্রিভুজ জলদুর্গের দ্বিতীয় স্থাপনা ভ্রমণ

হাজীগঞ্জ দুর্গ: ত্রিভুজ জলদুর্গের দ্বিতীয় স্থাপনা ভ্রমণ

মাদিহা মৌ : শীতলক্ষ্যা নদীর পশ্চিম তীরে নারায়ণগঞ্জ জেলার বন্দরে অবস্থিত একটি মোঘল জলদুর্গ। নদীপথে ঢাকার সাথে সংযোগকারী গুরুত্বপূর্ণ নদীপথগুলোর নিরাপত্তা বিধানের জন্য মোঘলগণ “ট্রায়াঙ্গল ওয়াটার ফোর্ট” বা “ত্রিভুজ জলদুর্গ” নির্মাণ করেছিলেন। ১৬৫০ সালের কিছু আগে-পরে নির্মিত হয়েছিল এই সব দুর্গ। এই তিনটি জলদুর্গের একটি হচ্ছে হাজীগঞ্জ দুর্গ। অপর দুটি হচ্ছে নারায়ণগঞ্জের সোনাকান্দা জলদুর্গ ও মুন্সীগঞ্জের ইদ্রাকপুর জলদুর্গ।

মুন্সি রহমান আলী তাঁর এক গ্রন্থে লিখেছেন, মীর জুমলা দুর্গটি নির্মাণ করেন। অন্যদিকে আহম্মাদ হাসান দানি তার ‘মুসলিম আর্কিটেক্টচার ইন বেঙ্গল’ গ্রন্থে বলেছেন, ইসলাম খান ঢাকায় রাজধানী স্থাপন করার পর এটি নির্মাণ করেন। দুর্গে কোনো শিলালিপি না থাকায় বিষয়টি অমীমাংসিত রয়ে গেছে।

                                                         হাজিগঞ্জ দুর্গের প্রবেশপথ। সোর্স:Foujeya Yeasmin

হাজীগঞ্জ জলদুর্গটি খিজিরপুর দুর্গ নামেও পরিচিত। এটি শীতলক্ষ্যার সঙ্গে পুরাতন বুড়িগঙ্গার সঙ্গমস্থলে নির্মিত হয়।

চতুর্ভুজাকৃতির এই দুর্গের পঞ্চভুজি বেষ্টন-প্রাচীরে রয়েছে বন্দুক ঢুকিয়ে গুলি চালাবার উপযোগী ফোকর এবং চারকোণে গোলাকার বুরুজ। প্রাচীরের চারদিকে অভ্যন্তরভাগে দেয়ালের ভিত থেকে ১.২২ মিটার উঁচুতে রয়েছে চলাচলের পথ এবং এর দেয়ালেও আছে গুলি চালাবার উপযোগী ফোকর। চারকোণের প্রতিটি বুরুজের অভ্যন্তরভাগে দুর্গ প্রাচীরের শীর্ষ পর্যন্ত বিস্তৃত সিঁড়ি এবং বহির্গত অংশে রয়েছে বন্দুকে গুলি চালাবার প্রশস্ততর ফোকর।

                                                                পর্যবেক্ষণ বুরুজ। সোর্স: Foujeya Yeasmin

দুর্গের চতুর্ভুজাকৃতির অঙ্গনের এক কোণে রয়েছে ইটের তৈরি একটি সুউচ্চ চৌকা স্তম্ভ। এটি সম্ভবত একটি পর্যবেক্ষণ বুরুজ। এই স্তম্ভের অবস্থান থেকেই দুর্গটিকে সমসাময়িক অপরাপর জলদুর্গের সমগোত্রীয় বলে ধরে নেয়া যায়। কামান বসানোর উপযোগী উঁচু বেদীর অবস্থান দুর্গটির একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য।

দুর্গের উত্তর দেয়ালেই দুর্গের একমাত্র প্রবেশপথ ‘দুর্গ তোরণ’। কিছুটা উঁচু এই দুর্গে ঢুকতে হলে আপনাকে প্রবেশ তোরণের প্রায় ২০টি সিঁড়ি ডিঙ্গাতে হবে। আর তোরণ থেকে দুর্গ চত্বরে নামতে হবে ৪টি ধাপ। প্রাচীরের ভেতরে চারদিকে চলাচলের পথ রয়েছে প্রাচীর ঘেঁষেই।

                                                                শীতলক্ষ্যা নদী। সোর্স: Foujeya Yeasmin

প্রায় দুই কিলোমিটার জায়গা নিয়ে এই দুর্গটি বিস্তৃত। দুর্গের মাঝে পুরোটাই ফাঁকা মাঠ। ধারণা করা হয়, এখানে অবস্থান নেয়া সৈন্যরা এ মাঠে তাঁবু খাটিয়ে রাত্রি যাপন করতো। বর্তমানে মাঠটি বাচ্চাদের খেলার মাঠে পরিণত হয়েছে।

পাঁচ কোণাকার এই কেল্লা বা দুর্গটি দৈর্ঘ্যে পূর্ব-পশ্চিমে প্রায় ২৫০ ফুট আর উত্তর-দক্ষিণে প্রায় ২০০ ফুট। দুর্গের ভেতরে দক্ষিণ কোণে একটি উঁচু মানমন্দির বা ওয়াচ টাওয়ার রয়েছে যা আজ প্রায় ধ্বংসপ্রাপ্ত।
দুর্গে চত্বরের পশ্চিম দিকে আছে বেশ বড় একটি আমগাছ আর পূর্বপাশে আছে বড় একটি লিচুগাছ। লিচুগাছটি বিচিত্রভাবে বেঁচে আছে তার অর্ধেক ক্ষয়ে যাওয়া দেহ নিয়ে।

                                        কামান বসানোর উপযোগী উঁচু বেদীর অবস্থান। সোর্স: Foujeya Yeasmin

সময়ের ধারাবাহিকতায় বিভিন্ন লোক ব্যবহার করতেন এ দুর্গ নিরাপত্তার জন্য। আবার কখনও এখান থেকে পরিচালনা করেছেন যুদ্ধ। এক সময় ঢাকার নবাবেরা এটিকে ঘিরে হাফেজ মঞ্জিল নামক একটি প্রাসাদ ও উদ্যান নির্মাণ করেছিলেন এমন জনশ্রুতিও আছে। এক সময়ের রক্ত হিম করা নাম হাজীগঞ্জ দুর্গ এখন এক নীরব নিস্তব্ধ পুরাকীর্তি। কেল্লার পথে খাসজমির ওপর পাটগুদামগুলো স্বাধীনতার পর থেকে অস্থায়ী লিজের কারণে সৌন্দর্য ক্ষুণ্ণ হতে থাকে।

পাঁচ কোণাকার এই কেল্লা বা দুর্গটি দৈর্ঘ্যে পূর্ব-পশ্চিমে প্রায় ২৫০ ফুট আর উত্তর-দক্ষিণে প্রায় ২০০ ফুট। দুর্গের ভেতরে দক্ষিণ কোণে একটি উঁচু মানমন্দির বা ওয়াচ টাওয়ার রয়েছে যা আজ প্রায় ধ্বংসপ্রাপ্ত।

আমরা বাংলাদেশিরা কীভাবে নিজেদের সম্পদ, ঐতিহ্য আর গৌরবকে অনায়েসেই ভূলুণ্ঠিত করতে পারি তার জলজ্যান্ত উদাহরণ হাজীগঞ্জ আর সোনাকান্দা দুর্গ। জায়গা দুটি এখন পরিত্যক্ত। পরিচর্যাহীন, অসম্ভব নোংরা আর অসামাজিক কার্যকলাপের তীর্থস্থান। ভেতরে গরু-ছাগল চড়ে বেড়াচ্ছে, জায়গায় জায়গায় পশু-পাখির মলমূত্র, চারিদিকে দুর্গন্ধ। আর মূল স্থাপনাগুলো তো ধ্বংসের পথে!

জানা যায়, সোনাকান্দা ও হাজীগঞ্জ দুর্গ দুটি ১৯৫০ সালে জাতীয় প্রত্নতত্ত্ব বিভাগের আওতায় নিয়ে সংস্কার করা হয়। ১৮৯৬ সালে প্রকাশিত ‘লিস্ট অব অ্যানসিয়েন্ট মনুমেন্টস ইন বেঙ্গল’ গ্রন্থের সূত্রে জানা যায়, একসময় হাজীগঞ্জ দুর্গটি প্রায় ধ্বংস হয়ে যায়। পরে সংস্কার করতে গিয়ে এর অনেক রদবদল করা হয়।

কদম রসুল দরগা থেকে বেরিয়ে খেয়াঘাট পার হয়ে উঠলাম নৌকায়। নৌকা করে শীতলক্ষ্যা পার হয়ে গেলাম হাজিগঞ্জ দুর্গ। নদীরঘাট থেকে হাঁটা দূরত্বে দুর্গটা। পুরোপুরি সোনাকান্দা দূর্গের মতোই, কিন্তু আকারে কিছুটা ছোট। কিছুক্ষণ ছবি তুলতে দুর্গের এ মাথা থেকে ও মাথায় ঘুরে বেড়ালাম।

                                   দূর থেকে হাজিগঞ্জ দুর্গের আকার ধারণ করার চেষ্টা। সোর্স:Foujeya Yeasmin

হিমেল বললো, এই জায়গাটা স্থানীয় মাদকাসক্তরা দখল করে রাখে। সন্ধ্যে হয়ে আসছে, এখানে আর বেশিক্ষণ থাকা ঠিক হবে না। বেরিয়ে গেলাম।

কীভাবে যাবেন:

ঢাকার যে কোনো স্থান থেকে আপনাকে প্রথমে যেতে হবে, গুলিস্তান, যাত্রাবাড়ী বা কমলাপুর। গুলিস্তান বা যাত্রাবাড়ী থেকে নারায়ণগঞ্জ যেতে পারবেন এসি বা ননএসি বাসে। গুলিস্তানের বায়তুল মোকাররম মসজিদের দক্ষিণ গেট অথবা একটু দক্ষিণে মেয়র হানিফ ফ্লাইওভারে ওঠার পথে বন্ধন, আনন্দ, উৎসব বাসের টিকেট কাউন্টার রয়েছে যাতে চড়ে ৪০ মিনিটেই সরাসরি চলে আসতে পারবেন নারায়ণগঞ্জ।

আর কমলাপুর থেকে যাবেন ট্রেনে, ভাড়া ২০ টাকার বেশি নয়। কমবেশি ৪৫ মিনিটে পৌঁছে যাবেন ঢাকা থেকে ২২ কিলোমিটার দূরের নারায়ণগঞ্জে। নারায়ণগঞ্জ টার্মিনাল থেকে রিকশা বা অটোয় হাজিগঞ্জ দুর্গে।

কোথায় থাকবেন:

ঢাকার আশেপাশে হবার কারণে আপনি দিনে গিয়ে দিনেই ফিরতে পারবেন, তাই ওখানে থাকার চিন্তা না করলেও হবে। এরপরও যদি আপনি নারায়ণগঞ্জে রাত্রিযাপন করতে চান সেক্ষেত্রে আপনাকে নারায়ণগঞ্জ সদরে এসে হোটেল নিতে হবে।

সতর্কতা:

পুরাকীর্তি আমাদের সম্পদ। সেসব দেখতে গিয়ে আশেপাশে ময়লা ফেলে আসবেন না। দালানে নিজের নাম লিখে আসবেন না। নিজের দেশকে পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন রাখুন। নিজে না শুধরালে, অন্যজনের কাছে তা আশা করা বোকামি। আপনি নিজেই যদি দর্শনীয় জায়গাগুলো পরিষ্কার না রাখেন, অন্যজন রাখবে তা কী করে প্রত্যাশা করেন?

সতর্ক থাকুন।

নিরাপদ থাকুন।

বেড়াতে থাকুন।

হ্যাপি ট্রাভেলিং।

ফিচার ইমেজ: Foujeya Yeasmin

Facebook Comments

Check Also

বাংলাদেশে অনলাইন স্কুল কার্যক্রমে ভবিষ্যতের দ্বার উন্মোচন

♦ রাফিউ হাসান ♦ করোনার মহামারীতে স্থবির জনজীবন। গত চার মাসের উপর বন্ধ স্কুল, কলেজ, …

vv