ব্রেকিং নিউজঃ
Home / বিশেষ প্রতিবেদন / হাইমচরে তালিকা ভুক্ত হয়নি দুই মুক্তিযোদ্ধা!
মুক্তিযোদ্ধা আবুল খায়ের মাষ্টার ও মোহাম্মদ আলী পাটওয়ারী

হাইমচরে তালিকা ভুক্ত হয়নি দুই মুক্তিযোদ্ধা!

অমরেশ দত্ত জয় : চাঁদপুরের হাইমচরের দুই মুক্তিযোদ্ধা অজ্ঞাত কারনেই তালিকাভুক্ত হতে পারেনি। তারা হলেন ওই উপজেলার পশ্চিম চর কৃষ্ণপুর গ্রামের মুক্তিযোদ্ধা আবুল খায়ের মাষ্টার ও মোহাম্মদ আলী পাটওয়ারী। যারা কিনা মুক্তিযুদ্ধকালীন সময়ে মুক্তিযোদ্ধাদের অস্ত্রগুদাম পাহাড়া দিয়েছিলেন এবং প্রত্যক্ষ যুদ্ধে অংশগ্রহন করেছিলেন।অথচ বিএলএফের এই দুই সদস্য অদৃশ্য কারনেই মুক্তিযোদ্ধা তালিকা ভুক্ত হতে পারছেননা। দেশ স্বাধীন করার জন্য মুক্তিযুদ্ধ করা কোন সনদের জন্য নয়। তবুও জীবনের শেষ সময়ে এসে বেঁচে থাকাকালীন অবস্থায় মুক্তিযোদ্ধার রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি চান প্রকৃত এই দুই মুক্তিযোদ্ধা।
এলাকা সূত্রে জানা যায়, হাইমচর উপজেলার তৎকালীন পশ্চিমচর কৃষ্ণপুর গ্রামের আবুল খায়ের মাষ্টার, মোহাম্মদ আলী পাটওয়ারী,গোলাম রাব্বানী, বশির উল্লাহ বেপারী এবং আ. রাজ্জাক সহ মোট ৫ মুক্তিযোদ্ধা মুক্তিযুদ্ধকালীন সময়ে মুক্তিযোদ্ধাদের অস্ত্রগুদাম পাহাড়া দিয়েছিলেন। তৎকালীন ঐ সময়ে প্রথমে গন্ডামারা গ্রাম থেকে আলগী বাজারের উত্তর পার্শ্বে সোনা মিয়া সরদার বাড়ি ও সর্বশেষ অমর চান মাষ্টারের বাড়ীতে রাত দিন পালাক্রমে অমর চান মাষ্টারের বাড়ীর বসত ঘরকে তারা অস্ত্রগুদাম হিসেবে ব্যবহার করেন। আর সেই অস্ত্রগুদাম তারা চার কোনায় ৪ জন পালাক্রমে
পাহাড়া দিয়েছেন।
ওই সূত্রে আরো জানা যায়, বাগরা বাজারের উত্তর পার্শ্বে ডাকাতিয়া নদীতে পাক হানাদার বাহিনীর অস্ত্র ও খাদ্য সামগ্রী নিয়ে যাওয়ার সময় তৎকালীন চাঁদপুর দক্ষিন অঞ্চল কমান্ডার সৈয়দ আবেদ মুনছুর, সহকারি কমান্ডার আবুল হোসেন ঢালীর
নেতৃত্বে মুক্তিযোদ্ধাদের নিয়ে জীবন বাজি রেখে অক্টোবরের শেষের দিকে আক্রমন করে এবং পাক সেনাদেরকে পরাজিত করেন। আর এতে অংশ নেন দুই বিএলএফ সদস্য সহ মুক্তিযুদ্ধারা। তারা পাক সেনাদের অস্ত্র ও খাদ্যসামগ্রী জব্দ করে যা পরবর্তীতে মুক্তিযোদ্ধাদের মানসিক শক্তিকে আরো তরান্বিত করেছিলো। তৎকালীন সময়ে ২নং সেক্টরের কমান্ডার ছিলেন জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ভাগিনা শেখ ফজলুল হক মনি।
আর শেখ ফজলুল হক মনির অধীনে সৈয়দ আবেদ মুনছুরের নেতৃত্বে এই আবুল খায়ের মাস্টার ও মোহাম্মদ আলী পাটওয়ারী মুক্তিযুদ্ধের সময় জীবন বাজী রাখেন।দেশের জন্য যুদ্ধ করেন এবং অস্ত্রগুদাম পাহাড়া দেন। মুক্তিযুদ্ধে দেশ স্বাধীন হলে যখন পরবর্তীতে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান দেশে ফিরে আসেন। তখন বঙ্গবন্ধুর ডাকে সাড়া দিয়ে তৎকালীন ঢাকা স্টেডিয়ামে ১৯৭২ সালের ৩১ জানুয়ারী কমান্ডার সৈয়দ আবেদ মুনছুরের নেতৃত্বে বঙ্গবন্ধুর হাতে নিজের ব্যবহৃত ও অস্ত্রগুদামে অস্ত্র জমা দেন।খবর নিয়ে আরো জানা যায়, দেশ স্বাধীন হলে মোহাম্মদ আলী পাটওয়ারী বাংলাদেশ বিমানে ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগে ও আবুল খায়ের মাষ্টার তার সপ্রাবির যোগদান করে দেশ সেবায় মনোনিবেশ করেন।
মুক্তিযোদ্ধা মোহাম্মদ আলী পাটওয়ারী মুক্তিযুদ্ধের পর শেখ ফজলুল হক মনি স্বাক্ষরিত সরাষ্ট্র মন্ত্রনালয় হতে মুক্তিযুদ্ধে বিএলএফ সদস্য হিসেবে যুদ্ধে অংশগ্রহনের স্বীকৃতির সনদ প্রাপ্ত হন।
অন্যদিকে আবুল খায়ের মাষ্টার বাংলাদেশ মুক্তি ফ্রন্ট চাঁদপুর থানা শাখা কর্তৃক মুজিব বাহিনীর সদস্য হিসেবে মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহনের সনদ প্রাপ্ত হন। যার নং-২৭৬। এই ২ মুক্তিযোদ্ধার সহযোদ্ধা গোলাম রাব্বানী ও বশির উল্লাহ বেপারী মুক্তিযোদ্ধার স্বীকৃতি পেয়ে তালিকা ভুক্ত হন। অপর সহযোদ্ধা আ. রাজ্জাক মুক্তিযোদ্ধার রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি না পেয়ে মনোকষ্টে হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যু বরন করেন।
এদিকে গেলো ২০১৭ সালের শুরুতে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নির্দেশে মুক্তিযুদ্ধা মন্ত্রনালয় নতুন করে মুক্তিযোদ্ধা যাচাই বাচাই শুরু করলে এই দুই মুক্তিযোদ্ধা প্রয়োজনীয় সকল কাগজপত্র যাচাই বাচাই কমিটির নিকট জমা দেন। তাদের নাম সহ হাইমচর থেকে ৩০ জনের একটি নামের তালিকা মুক্তিযোদ্ধা মন্ত্রনালয়ে পর্যন্ত পাঠানো হয়। সেখানে যাচাই বাচাই তালিকাতে আবুল খায়ের মাষ্টারের নং-১১ এবং মোহাম্মদ আলী পাটওয়ারীর নং-১২। তবে ওই তালিকা কি অবস্থায় রয়েছে তার কোন হদিস নেই। শুনা যাচ্ছে আবারও এই তালিকা হতে নতুন করে যাচাই বাচাই করা হবে। এতে এই দুই মুক্তিযোদ্ধার দাবী, আমাদের মুক্তিযুদ্ধকালীন কামন্ডার সৈয়দ আবেদ মুনছুর আমাদের কামন্ডার হিসেবে তিনি দেশে থাকলে রাজ স্বাক্ষী হতেন। আমরা যেই যেই বাড়িতে অস্ত্র গুদাম পাহাড়া দিয়েছিলাম,সেই বাড়িগুলোর মধ্যে অমর চান মাস্টার এখনও জীবিত রয়েছেন।
তাঁকে জিজ্ঞাসা করলে তিনি তার বাড়িতে এক মাসের অধিক যে পাহাড়া দিয়েছে তার স্বাক্ষী দিবেন। কেননা আবুল খায়ের মাষ্টারের বাড়ি ছিলো অমর চান মাষ্টারের পাশের বাড়ি। আর এই আবুল খায়ের মাষ্টারের বাড়ি হতেই তাদের খাদ্য সরবরাহ করা হতো।
২৪ ফেব্রুয়ারী সোমবার এ সম্পর্কে জানতে চাইলে সপ্রাবির অবসর প্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক অমর চান মাস্টার এ প্রতিনিধিকে জানান, মোহাম্মদ আলী ও আবুল খায়ের মাষ্টার প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধা। তারাসহ পাঁচ জন মুক্তিযোদ্ধা আমার ওই ঘর টিতে অস্ত্র রেখে পালাক্রমে ৪ কোনায় ৪ জন পাহাড়া দিয়েছেন। আমার দুঃখ হয় অনেক ভূয়া মুক্তিযোদ্ধা রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি পেয়েছে। অথচ এই পাঁচ জনের মধ্যে বেঁচে থাকা এ দুই জন আজও স্বীকৃিত পাননি।
এ সম্পর্কে মোহাম্মদ আলী পাটওয়ারী নিজের অনুভূতি প্রকাশ করতে গিয়ে বলেন, আমরা মুক্তিযুদ্ধকালীন জীবনবাজী রেখে যুদ্ধ করলাম,অস্ত্রগুদাম পাহাড়া দিলাম। কিন্তু মুক্তিযুদ্ধার রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি পেলাম না। শেষ বয়সে এসে জননেত্রী শেখ হাসিনার নিকট দাবী, তিনি যেনো আমাকে মৃত্যুর পূর্বে রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতির ব্যবস্থা করেন।
আবুল খায়ের মাষ্টার বলেন, আমার সহযোদ্ধা পাঁচ জনের দুই জন মুক্তিযোদ্ধা স্বীকৃতি পেয়ে দুনিয়া হতে বিদায় নিয়েছেন। প্রধান মন্ত্রীর নিকট আমার একটাই চাওয়া। তার হাত ধরেই যেন আমাকে রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি দিয়ে মুক্তিযোদ্ধার তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়।
Facebook Comments

Check Also

চাঁদপুরে ঈদের নামাজে করোনা হতে মুক্তি পেতে মসজিদ গুলোতো কান্নার রোল

সাইফুল ইসলাম সিফাত : বিশ্বব্যাপি ছড়িয়ে পড়েছে করোনা ভাইরাস। এর মধ্যে বাদ যায়নি বাংলাদেশও। তাই …

vv