ব্রেকিং নিউজঃ
Home / বিশেষ প্রতিবেদন / সাড়ে ৯ মাস বন্ধে নিস্তব্ধ চাঁদপুরের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো: ভেঙ্গে যাচ্ছে শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যৎ
দীর্ঘ সময় বন্ধ থাকায় শিক্ষার্থীবিহীন নিস্তব্ধ চাঁদপুর সদর উপজেলার মহামায়া সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়।

সাড়ে ৯ মাস বন্ধে নিস্তব্ধ চাঁদপুরের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো: ভেঙ্গে যাচ্ছে শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যৎ

মাসুদ হোসেন : করোনা ভাইরাসের সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়ার পর সারা দেশের মতো চাঁদপুরের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোও গত মার্চ মাস থেকে টানা সাড়ে ৯ মাস ধরে বন্ধ হয়ে আছে। সরকারি নির্দেশে এত দীর্ঘ সময় বন্ধ থাকায় জেলার প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্কুলগুলো পড়ে আছে নিস্তব্ধ। এত দীর্ঘ সময় বন্ধ থাকায় লেখাপড়া বন্ধ করে দিয়েছে শিক্ষার্থীরা। শিক্ষাবিহীন শিক্ষার্থীরা বড় হয়ে চাকরি থেকে বঞ্চিত হতে হবে। এতে ভেঙ্গে যাচ্ছে অসংখ্য শিক্ষার্থীর ভবিষ্যৎ। সরকার অনলাইন ক্লাস নিলেও গুরুত্ব দিচ্ছে না শিক্ষার্থীরা। কেউ কেউ পড়াশুনা ছেড়ে দিয়ে কর্মপেশা কিংবা অন্যত্র চলে যাচ্ছে।
এছাড়াও জেলার মাধ্যমিক ও মাদ্রাসাগুলোতে ১ জানুয়ারি বই উৎসবে শিক্ষার্থীদের হাতে বই তুলে দিলেও পড়াশোনায় মনোযোগী হবে কিনা তা সন্দেহ। এদিকে অনেক স্কুল প্রথম দৃষ্টিতেই মনে হয়, এগুলো যেন পরিত্যক্ত ভবন। ধুলো-ময়লায় নোংরা হয়ে আছে স্কুলের আঙিনা। স্যাঁতস্যাঁতে হয়ে আছে ক্লাসঘরের মেঝে। ধুলোর পরতে ঢেকে গেছে কোমলমতি শিক্ষার্থীদের বসার বেঞ্চগুলো। ঝোপঝাড় আর লতাগুল্মের দখলে শিক্ষার্থীদের প্রিয় খেলার মাঠ। এ অবস্থায় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খুলে দেওয়া হলে সেখানে কীভাবে লেখাপড়া, খেলাধুলা সম্ভব হবে, স্কুলগুলো সরেজমিনে দেখার পর বুঝে ওঠা সম্ভব নয়। সর্বশেষ গত ১৭ ডিসেম্বরের এক বিজ্ঞপ্তিতে শিক্ষা মন্ত্রণালয় থেকে বলা হয়েছে, করোনা ভাইরাসের সংক্রমন থেকে শিক্ষার্থীদের সুরক্ষার লক্ষ্যে পূর্বের ধারাবাহিকতায় আগামী ১৬ জানুয়ারি ২০২১ পর্যন্ত সকল ধরনের শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকবে। এরপর থেকে যদি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খুলে দেওয়া হয়, তাহলে চাঁদপুরের স্কুলগুলোতে আবার লেখাপড়ার পরিবেশ ফিরিয়ে আনার মতো সময় খুব একটা হাতে নেই।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন না থাকলে হুট করে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান খোলা হলে অস্বাস্থ্যকর পরিবেশের মুখোমুখী হবে শিক্ষার্থীরা। এতে করে নানা ধরনের শারীরিক সমস্যাসহ মানসিকভাবেও ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে কোমলমতি শিক্ষার্থীরা। করোনার প্রাদুর্ভাবের কারণে সরকারি নির্দেশনা অনুযায়ী গত ১৮ মার্চ হতে বন্ধ রয়েছে জেলার সকল শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। দীর্ঘসময় বন্ধ থাকার পর প্রতিষ্ঠানগুলো খুলে দেবার আগে শতভাগ স্বাস্থ্য নিরাপত্তা দাবি করেছেন শিক্ষার্থীদের অভিভাবকারা।
চাঁদপুর জেলা শিক্ষা অফিস সূত্রে জানা গেছে, এ জেলায় সরকারি প্রাথমিক শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ১ হাজার ১৫৬টি। জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মোঃ সাহাব উদ্দিন অবশ্য জানান, প্রত্যেক প্রতিষ্ঠানপ্রধানকে নির্দেশনা দেয়া আছে ভবন ও ক্লাসরুমগুলো পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখা হয়। কিন্তু সরেজমিন ঘুরে দেখার সময় এ নির্দেশনা না মানার সংখ্যা কয়েকটিতে চোখে পড়েছে। তবে কয়েকটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে এই দীর্ঘ ছুটির সময় কাজে লাগিয়ে ভবন সংস্কার, নতুন ভবন নির্মাণ ও প্রয়োজনীয় মেরামত কাজ সেরে ফেলতে দেখা গেছে।
জেলার হাজীগঞ্জ উপজেলার ২নং বাকিলা ইউনিয়নের দক্ষিণ শ্রীপুর সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়, সদরের মহামায়া সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়, মতলব দক্ষিণের উপাদী দক্ষিণ ইউনিয়নের বাকরা সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয় ঘুরে দেখা গেছে বিদ্যালয় বন্ধ থাকলেও অফিস কক্ষে দুই একজন কর্মকর্তা কর্মচারীরা বসে আছে। আর কিছু কিছু বিদ্যালয়ের সামনে মাঠ ভরতি ঘাস। শিক্ষার্থীরা স্কুলে না আসায় মাঠ পরিষ্কারের প্রয়োজনীয়তাও যেন মনে করছে না কেউ। এক সময় স্কুলটির যে বিশাল মাঠটি শিশুদের পদচারণা আর খেলাধুলায় মুখর থাকতো, তা এখন ঝোপঝাড়ের দখলে।
কয়েকটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে গিয়ে দেখা গেল, স্কুলের বাইরে থেকে জানালার ফাঁক দিয়ে চোখে পড়লো ধুলোয় ঢেকে যাওয়া টুল বেঞ্চ-টেবিলগুলো। বারান্দাটি দেখলে মনে হলো, কোনো একটি নতুন ভবন পরিত্যক্ত হয়ে পড়ে আছে। স্থানীয়রা  জানান, প্রধানশিক্ষকের রুমটি খোলা হলেও কয়েক মাসে ক্লাসরুম পরিষ্কার বা দরজা-জানালা খুলতে দেখা যায়নি কাউকে। স্কুল খোলা থাকলে ছাত্রছাত্রীদের হইচই খেলাধুলায় মাঠটি মুখর থাকতো। স্কুল বন্ধ, খেলাধুলাও বন্ধ। মাঠে বড় বড় ঘাসের জঞ্জাল। আশা করছি, স্কুল খোলার আগেই কর্তৃপক্ষ মাঠটি খেলার উপযোগী করে তুলবে। পাশাপাশি ক্লাসরুমগুলোকেও স্বাস্থ্যকরভাবে পরিচ্ছন্ন করবে। অনেকে বলছেন দীর্ঘদিন স্কুল বন্ধ থাকার পর কোমলমতি শিক্ষার্থীরা যদি স্কুলে গিয়ে প্রথমেই দেখে, তার প্রিয় স্কুলটিতে পোকামাকড়ের বাসা বা জঞ্জালে ভরতি; তাহলে তারা প্রথমেই মনস্তাত্বিক আঘাতের শিকার হবে।
এছাড়া দীর্ঘদিন ধরে বদ্ধ কক্ষে হুট করে শিক্ষার্থীরা অবস্থান করলেই বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত হতে পারে। ক্লাসরুমগুলোতে বাতাস চলাচলের ব্যবস্থা করে শুষ্ক রাখা প্রয়োজন।
চাঁদপুর জেলা কিন্ডারগার্টেন এসোসিয়েশনের সভাপতি মোঃ ফজলুল করিম বাছেত এ প্রতিবেদককে বলেন, মহামারী করোনাভাইরাসের এই সময়ে শিক্ষা ব্যবস্থা অনেকটাই ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। জেলায় ৪৮০ টি কিন্ডারগার্টেনের হাজার হাজার কোমলমতি শিক্ষার্থীর জন্য নিয়োজিত শিক্ষকরা আজ বেকার হয়ে বসে আছেন। আবার কেউ কেউ শিক্ষকতা ছেড়ে দিয়ে অন্য পেশায় ঝুঁকছেন। জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মোঃ সাহাব উদ্দিন বলেন, ‘সরকারি নির্দেশনা মোতাবেক আমরা স্কুলের ভবন ও আঙিনা পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন করার জন্য প্রতিটি প্রতিষ্ঠানকে জানিয়েছি। আমরা প্রস্তুত আছি স্কুল খুলে ক্লাস নেবার জন্য। সরকার যখনই নির্দেশনা দেবে, আমরা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোকে প্রস্তুত করবো।
আরেক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, আমাদের কাছে প্রায় শতভাগ বই পৌছে গেছে। আমরা জানুয়ারির ১ তারিখ থেকে সকল শিক্ষার্থীর হাতে বই তুলে দিতে পারবো এবং স্কুল না খোলা পর্যন্ত অচিরেই জুম অ্যাপসের মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের জন্য অনলাইন ক্লাস চালু হবে। সেই সাথে শিক্ষার্থীদের অভিবাবকদেরও গুরুত্ব দিতে হবে।
Facebook Comments

Check Also

চাঁদপুর জেলা প্রশাসকের মহতি উদ্যােগ সর্বমহলে প্রশংসিত

সজীব খান : চাঁদপুর জেলা প্রশাসক অঞ্জনা খান মজলিশের মহতি উদ্যােগে সর্বমহলে তিনি প্রশংসিত হচ্ছেন। …

Shares
vv