ব্রেকিং নিউজঃ
Home / প্রিয় অনুসন্ধান / সন্তানের লাশ নিয়ে রাস্তায় চাঁদপুরের মা, দাফনে এগিয়ে আসেনি কেউ!

সন্তানের লাশ নিয়ে রাস্তায় চাঁদপুরের মা, দাফনে এগিয়ে আসেনি কেউ!

মাসুদ হোসেন : প্রাণঘাতি এক ভাইরাসের নাম হলো করোনা ভাইরাস। আর এই ভাইরাস লন্ডভন্ড করে দিয়ে যাচ্ছে মানবজীবকে। তার ভয়াল থাবায় মানবিকতা হারিয়ে ফেলছে মানুষ। কেউ কারো কোন সহযোগিতায় এগিয়ে আসছেন না। হৃদয়হীনের মত জীবনের শেষ কেউ এসে পাশে দাঁড়াচ্ছেন না। যাদের সাথে জীবনের অনেকটা সময় ব্যয় করেছিলেন তারাও শেষ মুহুর্তে এসে স্বার্থপরের মতো আচরন শুরু করেছেন।

ঠিক এমনই একটি ঘটনা ঘটেছে চাঁদপুর সদর উপজেলার ৪নং শাহমাহমুদপুর ইউনিয়নের বাসিন্দা ও মহামায়া বাজারের বিশিষ্ট ফার্মাসিস্ট রাজীবের বেলায়।

গত ৩০ মে শনিবার বিকেল ৪টায় শ্বাস কস্ট নিয়ে ৪০ বছর বয়সে মারা যান চাঁদপুর সদর উপজেলার ৪নং শাহমাহমুদপুর ইউনিয়নের মধ্য লোধেরগাঁও গ্রামের বাসিন্দা, মহামায়া পশ্চিম বাজারের আঃ রাজ্জাক সুপার মার্কেটের বিশিষ্ট ঔষধ বিক্রেতা ও মতলব দক্ষিণের উপাদী দক্ষিণ ইউনিয়নের ধলাইতলী মাদ্রাসার শিক্ষক মোঃ মঞ্জুর আহমেদ রাজীব।

তিনি দীর্ঘদিন যাবত তার নানার বাড়ি এলাকায় জমি ক্রয় করে বসবাস করে আসতেছিলেন। তার বাবা বীর মুক্তিযোদ্ধা আবু তাহের ভুঁইয়া। রাজীবের লাশ দাফনের জন্য ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলার কসবা উপজেলার বায়েক ইউনিয়নের সাগরতলা গ্রামে তার পৈত্রিক বাড়িতে নিয়ে যান স্বজনরা। কিন্তু সেখানে ঘটেছে এক অনাকাঙ্খিত ঘটনা।

জানা যায়, শ্বাস কস্ট ও বুকে ব্যথা দেখা দিলে গত ৩০ মে শনিবার চাঁদপুর সদর হাসপাতালে দুপুর ২টায় ছেলে রাজীবকে নিয়ে যান অবসরপ্রাপ্ত পরিবার পরিকল্পনা মাঠকর্মী ফেরদৌসী আক্তার পিয়ারা। কর্তব্যরত চিকিৎসক প্রাথমিক চিকিৎসা দিয়ে ইসিজি করে রোগির অবস্থা বেগতিক দেখে দ্রুত ঢাকায় রেপার করেন। ঢাকা নেয়ার পথে মতলবের কাছাকাছি যাওয়ার পর এম্ব্যুলেন্সে তার মৃত্যু হয়। সেখান থেকে লাশ দাফনের জন্য ব্রাহ্মণবাড়িয়ার কসবা উপজেলার বায়েক ইউনিয়নের সাগরতলা গ্রামে নিয়ে যান স্বজনরা। সেখানে কোন লোকের উপস্থিতি না দেখে এম্ব্যুলেন্স চালক লাশ নামিয়ে দিয়ে চলে যান তার ঠিকানায়। তখন সময় প্রায় রাত ১০টা। কোন উপায় না পেয়ে বীর মুক্তিযোদ্ধার এই সন্তানকে নিয়ে বাড়ির পাশে রাস্তায় বসে থাকেন তার গর্ভধারিণী মা। তার আত্মচিৎকারে কেউ এগিয়ে আসেনি মুক্তিযোদ্ধার এই পরিবারটির পাশে। তখন রাজীবের স্ত্রী মুন্নি বেগম ও রাজীবের সহজ সরল ছোট ভাইটিই একমাত্র ভরসা। বাড়ি ও এলাকার কেউ এগিয়ে না আসায় বিষয়টি তার বোন চাঁদপুর থেকে ৯৯৯ নম্বরে কল দিয়ে প্রশাসনের সহযোগিতা চান। এবং পরিবারের পক্ষ থেকে স্থানীয় ইউপি চেয়ারম্যানকে জানানো হলে কসবা উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান, কসবা থানার অফিসার ইনচার্জ, বায়েক ইউপি চেয়ারম্যান, ইউনিয়ন আওয়ামীলীগের সভাপতিসহ স্থানীয় নেতৃবৃন্দরা ঘটনাস্থলে এসেছেন। তাদের সহযোগিতায় রাত প্রায় পৌনে ৩টায় রাজীবের লাশ দাফন করা সম্পন্ন হয়।

ওখানে ঘটে যাওয়া পুরো ঘটনাটি ভিডিও করেছিলেন স্থানীয় এক সংবাদকর্মী।

এ বিষয়ে বীর মুক্তিযোদ্ধা আবু তাহের ভুঁইয়ার স্ত্রী ফেরদৌসি আক্তার পিয়ারা জানান, আমার ছেলে একজন সচেতন ব্যক্তি ছিলেন। আমার অসুস্থতার জন্য চাঁদপুর হাসপাতালে ভর্তি ছিলাম। সেসময় রাজীব আমার জন্য বৃষ্টিতে ভিজে মোটরসাইকেলে করে খাবার নিয়ে যেতেন। সেখান থেকে তার ঠান্ডা লেগে কিছুটা শ্বাস কস্ট ও অতিমাত্রায় ডায়াবেটিস বেড়ে যাওয়ায় সদর হাসপাতালের জরুরী বিভাগে নিয়ে প্রাথমিক চিকিৎসা শেষে চিকিৎসকের পরামর্শ অনুয়ায়ী ঢাকায় নেয়ার পথে স্ট্রোক করে সাথে সাথে মারা যান।

শাহমাহমুদপুরে কবরস্থানের জায়গা না থাকায় ছেলের লাশ দাফনের জন্য তার পৈত্রিক বাড়িতে যাওয়ার আগেই আমার ভাসুর অর্থাৎ রাজীবের জেঠা জাহাঙ্গীর মাস্টার ঐ এলাকায় গুজব ছড়িয়ে দিয়েছে যে, আমার ছেলে করোনায় মারা গেছে। কেউ যাতে লাশের কাছে না আসে সেজন্য এলাকার সবাইকে সতর্ক করে দিয়েছে।

এদিকে কারো কোন সহযোগিতা না পেয়ে মুক্তিযোদ্ধা আবু তাহের ভুঁইয়াসহ কোন একজনকে দিয়ে কবর করে রেখে দিয়েছেন কিন্তু কাপনের কাপড় আনতে পারেননি হতভাগা এই বাবা। আমরা রাজীবের পৈত্রিক বাড়িতে যাওয়ার পর জনশূণ্য এলাকায় রাস্তার পাশে সন্তানের লাশ নিয়ে বসে ছিলাম। বাড়ির মানুষরা ঘর এবং বাহিরের বাতিগুলো পর্যন্ত বন্ধ করে রেখেছে যাতে করে মানুষজন আমাদের কোন সহযোগিতা করতে না পারে। অন্ধকার এই রাতে আমার সাথে ছেলের বউ আর আমার সহজ সরল ছোট ছেলেটি ছিল। পরে প্রশাসনের লোকজন এসে তাদের অনুরোধে বাড়ির লোকজন বারান্দার লাইট জ্বালান। সেসময় কারো সহযোগিতা না পেয়ে নিজেই গরম পানি করে ছেলেকে গোসল করিয়ে কাপনের কাপড় পড়িয়ে প্রশাসনের সহযোগিতায় প্রিয় সন্তানের লাশ দাফন কাজ সম্পন্ন করা হয়।

এদিকে নিজ এলাকা শাহমাহমুদপুরেও এলাকাবাসীর বিভিন্ন অত্যাচারে অতিষ্ঠ হয়ে আছি। শাহমাহমুদপুর ইউনিয়ন আমার বাবার এলাকা। এ এলাকায় থেকে প্রায় ৪০ বছর যাবত পরিকল্পনা বিভাগে চাকরি করে এখন অবসরপ্রাপ্ত। এখানকার মানুষ আমার সাথে এমন আচরন করবে তা আগে জানা ছিল না। অভিযোগের সত্যতা জানার জন্য শাহমাহমুদপুর ইউপি চেয়ারম্যান স্বপন মাহমুদ এর সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনি বুধবার (৩ জুন) বিকেলে বলেন, আমার কাছে বিভিন্ন অভিযোগ নিয়ে আসেন রাজীবের মা পিয়ারা বেগম। আমি এ অভিযোগের বিষয়টি সমাধানের উদ্দেশ্যে আগামিকাল (বৃহষ্পতিবার) তাদের বাড়িতে যাবো এবং তাদের উত্থাপিত অভিযোগগুলো খতিয়ে দেখে ব্যবস্থা নেয়া হবে।

মঞ্জুর আহমেদ রাজীব করোনা উপসর্গ নিয়ে মারা যাওয়ার বিষয়ে স্বপন মাহমুদ বলেন, পুরো ইউনিয়নে ছড়াছড়ি হয়ে গেছে যে, রাজীব করোনায় মারা গেছে। অথচ চাঁদপুর সদর হাসপাতালের চিকিৎসকের রেপার স্লিপে লেখা করোনা নয় হৃদরোগে আক্রান্ত হওয়ায় ঢাকায় স্থানান্তর করা হয়েছে। পথিমধ্যেই সে স্ট্রোক করে এবং সাথে সাথেই তার মৃত্যু হয়।

ব্রাহ্মণবাড়িয়ার কসবায় রাজীবের লাশ দাফন শেষে বায়েক ইউপি চেয়ারম্যান আল মামুন ভুঁইয়া জানান, এই বাড়ির লোকজন ও এলাকাবাসী আমাকে অনুরোধ করেন যে, লাশটিকে যাতে এই এলাকায় না আনা হয়। কারন লোকটি নাকি করোনায় মারা গেছেন এবং তার পরিবার বলেছেন সে করোনায় মারা যান নি। কিন্তু সরকারী নিয়ম অনুসারে তার লাশ তো পৈত্রিক কবরস্থানে দাফনে বাঁধা দেয়া যাবে না। পরে আমি উপরস্থ নেতৃবৃন্দকে বিষয়টি অবগত করলে তারা ঘটনাস্থলে আসলে তাদের সহযোগিতায় দাফন কাজ সম্পন্ন হয়।

কসবা থানার অফিসার ইনচার্জ মোঃ লোকমান হোসেন বলেন, লোকটির মৃত্যু নিয়ে আমার দৃষ্টিগোচর হয়। করোনায় মারা গেছে জেনে এলাকার কেউই এগিয়ে আসেননি। যেহেতু তারা এ এলাকায় থাকতেন না সেহেতু এলাকার লোক জানেন নি যে রাজীব কিভাবে মারা গেছেন। তাই তারা এ গুজব ছড়িয়ে তাদের সহযোগিতায় এগিয়ে আসেনি। আমি বিষয়টি জেনে উপজেলা চেয়ারম্যান মহোদয়সহ ঘটনাস্থলে এসে অন্যান্য নেতৃবৃন্দের সহযোগিতায় শরিয়ত মোতাবেক সরকারী নির্দেশনা মেনে দাফন কাজ সম্পন্ন করতে সক্ষম হয়েছি। শেষ পর্যন্ত মুক্তিযোদ্ধা এই পরিবারটির পাশে থাকার চেষ্টা করেছি।

কসবা উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান রাশেদুল কাউসার ভুঁইয়া জীবন বলেন, আমাকে বিষয়টি জানালে আমি ইউপি চেয়ারম্যান ও ইউনিয়ন আওয়ামীলীগের সভাপতিকে ফোন করে কবর করার কথা বলি। পরে ইউনিয়ন আওয়ামীলীগের সভাপতির নেতৃত্বে কবর খুরে রাখেন। কিন্তু মুক্তিযোদ্ধা আবু তাহের ভুঁইয়ার কোন আত্মীয়স্বজন কেউ এগিয়ে আসেনি। আমি এবং ওসি সহ এসে লাশটিকে আমরা রাস্তার মধ্যে পেয়েছি। আমাদের নেতৃবৃন্দদের দিয়ে বাজারের দোকানদারকে জাগিয়ে দাফনের কাপড় আনা হয়। এবং লাশ দাফন করা হয়। তবে সবচেয়ে দুঃখের বিষয় হচ্ছে, এ এলাকার কিছু সচেতন নাগরিক আমাদের সহযোগিতা করেন নি। সবশেষে প্রশাসনের পক্ষ থেকে স্থানীয় মসজিদের ইমামসহ প্রশাসন ও রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দকে বিশেষভাবে কৃতজ্ঞতা জানানো হয়।

করোনা উপসর্গ নিয়ে মৃত্যুর বিষয় সম্পর্কে ঘটনার দিন চাঁদপুর সদর উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. সাজেদা বেগম পলিন দৈনিক চাঁদপুর খবরকে জানিয়েছেন, আমরা তার মৃত্যুর খবর পেয়েছি।

শুনেছি তার মরদেহ তার পৈত্রিক বাড়িতে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। ২৫০ শয্যা চাঁদপুর সরকারি জেনারেল হাসপাতালের আরএমও ডা. সুজাউদ্দৌলা রুবেল জানান, আমরা যদ্দূর জানি তার করোনা উপসর্গ ছিল না। তাই তিনি হাসপাতালের মেডিসিন ওয়ার্ডে চিকিৎসাধীন ছিলেন। হয়তো তার করোনা উপসর্গ থাকলেও তিনি তা লুকিয়েছেন- এ জন্য তার চিকিৎসা মেডিসিন ওয়ার্ডে চলছিল। তা না হলে যাদের করোনা উপসর্গ থাকে তাদেরতো আমরা আইসোলেশন ওয়ার্ডে ভর্তি করি। করোনার বিষয়টি নিশ্চিতের জন্য মঙ্গলবার মৃত মঞ্জুর আহমেদ রাজীবের পরিবারের ৩ সদস্যের নমুনা পরীক্ষার জন্য চাঁদপুরে দিয়ে এসেছেন।

Facebook Comments

Check Also

চাঁদপুরে অবৈধ গ্যাস পাম্প বসিয়ে রমরমা বাণিজ্য, কোটি টাকা রাজস্ব ফাঁকি

স্টাফ রিপোর্টার : চাঁদপুর জেলার মতলব উত্তর ও দক্ষিণ উপজেলা এবং কচুয়া উপজেলায় অবৈধ ভ্রাম্যমাণ গ্যাস …

vv