ব্রেকিং নিউজঃ
Home / বিশেষ প্রতিবেদন / শাহরাস্তিতে একই পরিবারের ৪ ভাইকে কেড়ে নিলো আর্সেনিক

শাহরাস্তিতে একই পরিবারের ৪ ভাইকে কেড়ে নিলো আর্সেনিক

মোঃ মাসুদ রানা,
সহ সম্পাদক, প্রিয় চাঁদপুর

চাঁদপুরের শাহরাস্তিতে একই পরিবারের ৫ সহোদরের ৪ জন আর্সেনিকেই আক্রান্তে মৃত্যু হয়েছে। বর্তমানে শুধু ওই পরিবারটি নয় সমগ্র উপজেলার ৩ লক্ষ অধিবাসীই আর্সেনিকের ঝুঁকিতে ডুবে রয়েছে। এ করুন বাস্তবতা তাড়া করছে এ জনপদের ১০টি ইউ’পি ও একমাত্র পৌরসভার নাগরিকদের মাঝে।

আজ থেকে ২৪ বছর পূর্বে দেশের সর্বচ্ছ আর্সেনিক প্রবল অঞ্চল হিসেবে এ জনপদকে চিহ্নিত করে ছিল। ওই সময় অষ্টেলিয়া, ফ্রান্স, ডেনমার্ক, বেলজিয়াম, জাপানসহ বিভিন্ন দেশের বিশেষজ্ঞ ও শিক্ষানবিশ কর্মীরা ছুটে আসে এখানে তা সর্ত্বেও জনসংখ্যা অনুপাতে বিশুদ্ধ খাবার পানির সরবারহ ব্যবস্থা আজও সে ভাবে গড়ে উঠেনি। এতে ভূক্তভোগিরা ঔই আর্সেনিক যুক্ত পানি পান করে কেউ জীবন,কেউ সংসার হারাচ্ছেন।

পার্শ্ববর্তী কচুয়া উপজেলার জনৈক গৃহবধূ নাহিদা (৩৬) ইউনি’ডো এনজিওতে আর্সেনিক চিকিৎসা করিয়ে ও স্বামীর সংসার টিকাতে পারেনি। বর্তমানে শাহরাস্তির গনমাধ্যাম কর্মী হেলাল উদ্দিন(৫৩)আর্সেনিক আক্রান্ত হয়ে দু,টি কিডনি বিকল হওয়ার পথে।অনেকে আর্সেনিক যুক্ত পানি দীর্ঘ মেয়াদে পান করে, শরীরে নানান অসূখে বাসা বাঁধিয়ে চরম অসুস্থতা নিয়ে মৃত্যুর প্রহর গুনছেন।

এদিকে বেসরকারি প্রাপ্ত্যতথ্যে জানায়, এ এলাকায় ২০১৫ সালের নভেম্বর থেকে ২০১৬ সালের নভেম্বর পর্যন্ত ঢাকার আইসিডিডিআর’বি বিজ্ঞানীরা একটি গবেষনা কার্যক্রম সম্পন্ন করেন।তখন আর্সেনিক ঝুঁকি মোকাবেলায় সেলিনিয়ামযুক্ত মসুর ডাল ঔষধ হিসেবে প্রয়োগের মাধ্যামে রোগীদের আরোগ্যের চেষ্টা করেন। ওই কার্যক্রমে ঔষধি ডাল কানাডা থেকে এনে ৮০ টি পরিবারের ৪০০ সদস্যকে উচ্ছমাত্রায় সেলিনিয়ামযুক্ত মসুরের ডাল খাওয়ানো হয়।

উপজেলার পৌর শহরের শ্রীপুর মহল্লার রাশেদা ওই গবেষনা কার্যক্রমের একজন মাঠকর্মী। তিনি ও তার পরিবারের ৪ সদস্য এ ডাল খাচ্ছেন।একই গ্রামের রোজিনা ও তাহমিনা দুই ভাসুর পত্নী (জা) এ ডাল খেয়ে যাচ্ছেন।ওই কার্যক্রমের সফলতায় সেলিনিয়ামযুক্ত মসুরের ডাল চিকিৎসা আলোর পথ দেখাবে বলে তারা আশায় রয়েছেন।

গত মাসের (২৫মে) সোমবার উপজেলার পৌর শহরের ৭নং ওয়ার্ডের নিজমেহার তালুকদার বাড়ির কৃষক মমতাজ উদ্দিনের চতুর্থ পুত্র আর্সেনিকে আক্রান্ত শেষে ক্যান্সারে ভুগে মৃত্যু হয়।ওই রোগের আগ্রাসনে পরিবারটির পাঁচ ভাইয়ের চার’জনকে অকালে জীবন দিয়ে মৃত্যুর মিছিলে যুক্ত হতে হয়।

ওই পরিবারের বেঁচে থাকা একমাত্র ছোট ভাই মোঃ মফিজুর রহমান জানান, ১৯৭৬ সালে তাদের বাড়ির পাশে মসজিদের সর্নিকটে স্থাপিত একটি টিউবওয়েলের পানি ওই পরিবার খেয়ে আসছিলো। পরে ১৯৮৬ সালে তাদের অর্থনৈতিক সক্ষমতা বাড়লে নিজ পরিবারের আঙিনায় আরো একটি টিউবওয়েল স্থাপন করে সে পানি খাওয়া শুরু করে।

ওই পরিবারের প্রথম সন্তান (বড় ভাই) রুহুল আমিন মানিক (৫৫) শাহরাস্তি সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ের শিক্ষকতা করতেন। ১৯৯১ সালে প্রথম একটি এনজিওর মাধ্যমে সনাক্ত হয় তিনি আর্সেনিক আক্রান্ত। পরে ২০০৪ সালে ঢাকার আইসিডিআির’বিতে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করিয়ে নিশ্চিত হন, আর্সেনিক বিষক্রিয়া শরীরের কতটা ক্ষতি করেছে। ওই বিষক্রিয়া ক্যান্সারে রূপ নিয়ে ২০০৭ সালের (১৫ফেব্রুয়ারী) শুক্রবার তিনি মৃত্যুপথের যাত্রী হন। তৃতীয় ভাই মোঃ মজিবুর রহমান (৪৮) একই বিদ্যালয়ের চতুর্থ শ্রেনীর চাকরি করতেন। একই ভাবে তাকেও আর্সেনিকের অক্টোপাস গিলে বসে আছে। টের পেতে পেতে তার শরীরটাকে ক্যান্সারে জিম্মি করে ফেলে।২০১৭ সালের বৃহস্পতিবার (১৯-অক্টোবর) তিনি মৃত্যুর নিকট হেরে যান।

দ্বিতীয় ভাই নুরুল আমিন(৫৫)বাড়ির পাশে পৌর শহরের তালতলা নামক স্থানে একটি চা স্টল দিয়ে জীবিকা নির্বাহ করতেন । ওই সময় চোখের সামনে দুই ভাইয়ের চলে যাওয়ার দৃশ্য দেখে নিজ স্বাস্থ্য নিয়ে নড়েচড়ে বসেন। কিছু পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে নিশ্চিত হন, তিনি একই রোগে আক্রান্ত। পরে ঢাকা মহাখালীতে অধিকতর পরীক্ষা-নিরীক্ষা শেষে শনাক্ত হয় শরীরটাকে ক্যান্সার দখলে নিয়েছে।২০১৮ সালের ১০এপ্রিল মঙ্গলবার তার জীবন প্রদীপটিও নিভে যায়।

এবার চতুর্থ ভাই হাবিবুর রহমান তার ৩টি ভাইয়ের অকালে চলে যাওয়ায় তিনি স্তব্ধ হয়ে যান। পরে তিনি চেষ্টা করেন,ওই সহোদরদের পরিবার-পরিজনকে বুদ্ধি পরামর্শ দিয়ে জীবন ও জীবিকার একটু আলো দেখাতে । চলছিল বেশ, কিছুটা সফলতা দেখতে পায় পরিবারগুলো। কিন্তু শেষ পরিণতি সেই একই অবস্থা। ওই পরিবারের চতুর্থ ছেলে হাবিবুর রহমান ২০১৯ সালে কানের ব্যথা নিয়ে ঢাকা মগবাজারের তাক্ওয়া স্পেশালাইজড হাসপাতালে (ঢামেকের) নাক-কান-গলা বিভাগের প্রধান ডাক্তার ইউসুফ ফকিরের নিকট চিকিৎসা নিতে ছুটে যান । তখনই তার সনাক্ত হয় টিউমার, সেটা অপসারণ করেন তিনি। পরে ঢাকা মহাখালী ক্যান্সার হাসপাতালে ত্রিশটি থেরাপি নিয়ে বেঁচে থাকার যুদ্ধটা চালিয়ে যান।

পরিবারের হিস্টরি মোতাবেক শনাক্ত হয় তিনিও আর্সেনিকের সেঁকো বিষ এর থাবায় মরণব্যাধি ক্যান্সার আক্রান্ত হয়েছেন। তারপর জাতীয় ক্যান্সার ইনস্টিটিউট চিকিৎসা করিয়ে জীবনটিকে গত (২৫মে) সোমবার সকাল পর্যন্ত বরাদ্দ করতে সক্ষম হন। ওইদিন ভোর ৬ টা ১৫ মিনিটে মৃত্যুর নিকট পরাজিত হন। মৃত্যুকালে তিনি একটি শ্রবণ প্রতিবন্ধী ছেলে ও দৃষ্টি প্রতিবন্ধী মেয়ে রেখে গেছেন। তিনি ভিটেমাটি সব হারিয়ে বেঁচে থাকার সংগ্রামে বিভিন্ন দুয়ারে ধর্না দিয়েছিলেন। কিন্ত বৈশ্বিক করোনা ছোবলে তার ওই সাহায্য পাওয়ার পথটুকু ও চিকিৎসা করানোর পরিবেশ অনুকূলে না থাকায় তিনি ধুকে ধুকে মৃত্যুকে আলিঙ্গন করতে বাধ্য হন বলে তার পরিবার জানায়।

এদিকে ওই পরিবারের পঞ্চম ভাই মফিজুল ইসলাম জীবিকার প্রয়োজনে কিছুদিন পূর্বে মালদ্বীপ থেকে প্রবাস জীবন যাপন করে করোণার পূর্বে দেশে ফিরে আসেন। তিনিও আর্সেনিকের বিষে আক্রান্ত। এবার জীবন যুদ্ধে মফিজের বেঁচে থাকার লড়াই।
এদিকে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট শিরিন আক্তার পরিবারটির কষ্টের কথা অবহিত হয়ে উপজেলা প্রশাসন থেকে সব ধরনের সহায়তার আশ্বাস দিয়েছেন।

উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা (ভারপ্রাপ্ত) ডাঃ অচিন্ত্য কুমার চক্রবর্তী (আরএমও) জানান, এ রোগে ২০১২ সালের পর থেকে সরকারি ভাবে কোনো ঔষধ সরবরাহ করা হচ্ছে না বলে জানান। আমরা রোগীদের ব্যবস্থাপত্র লিখে দিচ্ছি। তারা বাহির থেকে ঔষধ কিনে খাচ্ছে। ২০১৭ ডিসেম্বরে ৫হাজার ৬শ ৫৫ জন রোগীর পর আরো কিছু রোগী শনাক্ত করনের হিসেব পাওয়া যাবে।

পৌর মেয়র হাজী আঃ লতিফ জানান, সম্প্রতি দেশের ৪০টি পৌরসভার সঙ্গে শাহরাস্তি পৌরসভায় ওয়াটার ট্রিটমেন্ট প্লান স্থাপন এর গ্রোথ সেন্টারে অবস্থিত পানি সরবরাহ ও এনভায়রনমেন্টাল স্যানিটেশন প্রকল্পের আওতায় এ পৌরসভায় ভূপৃষ্ঠস্ত পানি শোধনাগার ও উচ্চ জলাধার নির্মান কাজের দ্রুতগতিতে এগিয়ে চলছে।

শাহরাস্তি উপজেলা জনস্বাস্থ্য প্রকৌশলী অফিসের সাবেক সিসিটি অতিরিক্ত দ্বায়িত্ব আঃ হালিম দ্বায়িত্বে থাকা কালিন জানান, ১৯৯৬ সালে প্রথম আর্সেনিক সনাক্ত হয়। তার পর থেকে এ পর্যন্ত শাহরাস্তি উপজেলায় ১ হাজার ৭শত ৮৫ টি গভীর নলকূপ স্থাপন করা হয়। আরো কিছু গভীর নলকূপ স্থাপন কাজ চলমান।

এ জনপদে মাত্রাতিরিক্ত আর্সেনিকের উপস্থিতি সম্পর্কে সংশি¬ষ্টরা জানান, অত্র উপজেলায় পল্লী বিদুৎতের বিষাক্ত খুটির পর্যাপ্ত অপসারন, নিয়ম নীতির তোয়াক্কা না করে ব্যাক্তি পর্যায়ে শ্যালোমেশিন ও গভীর নলকূপ বসানোর ফলে পানির স্তর নিচে নেমে যাচ্ছে।এতে সুপেয় খাবার পানির যোগানের একমাত্র ভূগর্ভস্থ উৎসটি হয়ে পড়ছে অনিরাপদ।

Facebook Comments

Check Also

মুক্তিযুদ্ধে বিজয়ী হলেও জীবনযুদ্ধে পরাজিত হাজীগঞ্জের গাজী আলী আহমদ

বিশেষ প্রতিনিধি : দেশমাতৃকার জন্য জীবন বাজি রেখে মুক্তিযুদ্ধে অংশ নিয়েছিলেন গাজী আলী আহমদ। ছিনিয়ে এনেছেন …

vv