ব্রেকিং নিউজঃ
Home / মতামত / মুক্তিযুদ্ধে কর্নেল অলির বীরত্ব : প্রতিবেদন যা লিখেছিলেন জিয়া ও মীর শওকত

মুক্তিযুদ্ধে কর্নেল অলির বীরত্ব : প্রতিবেদন যা লিখেছিলেন জিয়া ও মীর শওকত

ইসমাইল হোসেন বেঙ্গল : মুক্তিযুদ্ধের জীবন্ত কিংবদন্তি ডক্টর কর্নেল (অব.) অলি আহমদ বীর বিক্রম। ড. কর্নেল অলি আহমদ বীর বিক্রম (অব.) সততা, নিষ্ঠা, ন্যায়পরায়াণতার আদর্শের উজ্জল দৃষ্টান্ত। আজীবন তিনি দুর্নীতি এবং অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদী কন্ঠস্বর। নিজের প্রাপ্তির জন্য অন্যায়ের কাছে মাথা নত করেন নাই। মুক্তিযুদ্ধে তার অবদান, দেশপ্রেম অতুলনীয়।

ইতিহাসকে কখনো পরিবর্তন করা যায় না- কর্নেল অলি আহমদ বীরবিক্রমের ১৯৭৪ সালের বার্ষিক গোপনীয় প্রতিবেদনের ওপর প্রয়াত লেফটেন্যান্ট জেনারেল মীর শওকত আলী বীর-উত্তম যে মন্তব্য লিখেছিলেন তাই তার প্রমাণ।
ইংরেজিতে লেখা এ মন্তব্যে তিনি লেখেন, ‘সাংগঠনিক ব্যাপারে এ কর্মকর্তার রয়েছে অসাধারণ ক্ষমতা। তিনি অত্যন্ত কঠোর পরিশ্রমী এবং বর্তমান পদবি থেকেও বড় দায়িত্ব নেওয়ার সামর্থ্য তাঁর রয়েছে। যথাযথ পৃষ্ঠপোষকতা পেলে এ কর্মকর্তা একদিন সেনাবাহিনীর সম্পদ হতে পারেন। মুক্তিযুদ্ধের সময় তাঁর ভূমিকা ছিল অত্যন্ত প্রশংসনীয়। কার্যত তিনি ছিলেন প্রথম কর্মকর্তা যিনি ঝুঁকি নিয়ে নিজ উদ্যোগে একাত্তরের ২৫/২৬ মার্চ রাতে স্বাধীনতার ঘোষণার ব্যাপারে জেনারেল জিয়াউর রহমানকে অবহিত করেন।’

এ মন্তব্যটি জেনারেল মীর শওকত লিখেছিলেন ১৯৭৪ সালের ৮ মার্চ। এ দলিলটি স্বাধীনতা ঘোষণা নিয়ে অনাকাঙ্খিত যে বিতর্ক বাংলাদেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে আছে তার অবসানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। কারণ কর্নেল অলি সব কিছু অবহিত করার আগে জিয়াউর রহমান কোনো কিছুই অবহিত ছিলেন না। তিনি ব্যস্ত ছিলেন নিজের কাজে। মুক্তিযুদ্ধ শুরুর খবর তাঁকে প্রথম কর্নেল অলি জানান।

উল্লিখিত বার্ষিক প্রতিবেদনের শেষাংশে জেনারেল জিয়াউর রহমান বীর-উত্তর ঊর্ধ্বতন অফিসার হিসেবে লিখেছিলেন, ‘তিনি (কর্নেল অলি) পরিপূর্ণভাবে অনুগত এবং অত্যন্ত সাহসী একজন অফিসার। তিনি অত্যন্ত বুদ্ধিদীপ্ত এবং কর্মোদ্যোগী।’ জেনারেল জিয়াউর রহমান মুক্তিযুদ্ধের সময় জেড ফোর্সের কমান্ডার ছিলেন। যুদ্ধ শেষে বঙ্গবন্ধু সরকার কর্তৃক ভূষিত হয়েছেন বীর-উত্তম খেতাবে। কর্নেল অলি আহমদ যুদ্ধের সময় জেনারেল জিয়ার অধীনে ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করেছেন। জেনারেল শওকত ছিলেন অন্যতম সেক্টর কমান্ডার। এ তিনজনের মধ্যে দুজনই প্রয়াত হয়েছেন। এখন শুধু বেঁচে আছেন কর্নেল অলি আহমদ। মুক্তিযুদ্ধের সময়ের যে ঘটনাপ্রবাহ, তার সঠিকতা নিরূপণে এ তিনজনের স্বাক্ষরিত একটি দলিল মুক্তিযুদ্ধের জন্য একটি মূল্যবান সম্পদ।

ওই প্রতিবেদনে জেনারেল শওকত লিখেছেন, ২৫/২৬ মার্চ রাতে বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষিত হয়েছে বলে কর্নেল অলি জেনারেল জিয়াউর রহমানকে অবহিত করেন। অর্থাৎ ২৫ মার্চ দিবাগত রাতে স্বাধীনতার ঘোষণা দেওয়া হয়েছে। বার্ষিক গোপনীয় প্রতিবেদনে ঊর্ধ্বতন অফিসাররা তাদের অধীন অফিসারদের অসাধারণ ও অনন্য কাজগুলো তুলে ধরেন, যাতে তা দালিলিক প্রমাণ হিসেবে ওই অফিসারের পেশা পরিকল্পনায় সহায়ক হয়। এ ক্ষেত্রে জেনারেল শওকত কর্নেল অলির বীরত্বপূর্ণ ভূমিকার কথা তুলে ধরেছেন, অন্য কিছু নয়। জেনারেল জিয়াউর রহমান ওই একই প্রতিবেদনের একই পৃষ্ঠায় কর্নেল অলি সম্পর্কে সব ইতিবাচক মন্তব্য করেছেন। ওই লেখায় জেনারেল জিয়াউর রহমান জেনারেল শওকতেরও ঊর্ধ্বতন অফিসার হিসেবে তার মন্তব্য লিখেছেন। সুতরাং জেনারেল শওকত প্রতিবেদনে যা লিখেছেন তাতে যদি কোনো অসত্য কথা থাকত তাহলে জেনারেল জিয়া ঊর্ধ্বতন অফিসার হিসেবে সে ব্যাপারে দ্বিমত পোষণ করে নিজের মতামত দিতে পারতেন। বরং জেনারেল জিয়া কর্নেল অলি সম্পর্কে আরো উচ্ছ্বসিত প্রশংসা করেছেন। সুতরাং উপরোক্ত দলিল বলছে যে জেনারেল জিয়া, জেনারেল শওকত ও কর্নেল অলি- তিনজনে একই সঙ্গে সত্যায়িত করেছেন যে ২৫ মার্চ দিবাগত রাতে বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা করা হয়েছিল।

মুক্তিযুদ্ধে অসাধারণ সাহস ও বীরত্ব প্রদর্শনের জন্য ১৯৭১ যুদ্ধকালিন সময়ে সর্বপ্রথম বীর বিক্রম খেতাবে ভূষিত হয়েছেন। তিনি জিয়াউর রহমানের নেতৃত্বে চট্টগ্রামে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে বিদ্রোহে অংশ নেন। চট্টগ্রাম কালুরঘাট বেতার কেন্দ্র থেকে জিয়াউর রহমানের স্বাধীনতা ঘোষণার তিনি অন্যতম স্বাক্ষী।

ঢাকায় ক্র্যাকডাউনের খবর পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে মেজর জিয়ার নেতৃত্বে ক্যাপ্টেন অলি আহমদসহ অষ্টম ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের সৈনিকরা বিদ্রোহ করেন। ২৫ মার্চ ঢাকায় যখন পাকিস্তান হানাদার বাহিনী নিরস্ত্র বাঙালির ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে, তখন তিনি ছিলেন চট্টগ্রামে অষ্টম ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টে। সে সময় অষ্টম বেঙ্গল রেজিমেন্টের অধিনায়ক ছিলেন লেফটেন্যান্ট কর্নেল ঝানঝুয়া এবং সহ-অধিনায়ক ছিলেন মেজর জিয়াউর রহমান। বিদ্রোহের শুরুতেই রেজিমেন্ট অধিনায়ক ঝানঝুয়া নিহত হন। এরপর ব্যারাকে ফিরে মেজর জিয়া আনুষ্ঠানিক বিদ্রোহ ঘোষণা করেন। এ সময় ক্যাপ্টেন অলি আহমদ তার সঙ্গেই ছিলেন। ক্যাপ্টেন অলি আহমদের নেতেৃত্বে চট্টগ্রামের কালুরঘাট বেতার কেন্দ্র দখল করা হয়, সেখান থেকে মেজর জিয়াউর রহমান স্বাধীনতা ঘোষণা করেন।

১৩ এপ্রিল রাতে মেজর জিয়া ক্যাপ্টেন অলি আহমদকে মিরসরাইয়ে যেতে বলেন এবং ঢাকা থেকে চট্টগ্রামমুখী শত্রুবাহিনীর বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলার নির্দেশ দেন। নির্দেশনা পেয়ে রাতেই রামগড় থেকে ৩৫ মাইল দূরে মিরসরাইয়ে এসে ক্যাপ্টেন অলি আহমদ উপস্থিত হন। এ সময় তার সঙ্গে ছিল দুই প্লাটুন প্রাক্তন ইপিআর সদস্য এবং এক প্লাটুন নতুন প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত মুক্তিযোদ্ধা। অস্ত্রের মধ্যে ছিল একটি তিন ইঞ্চি মর্টার, একটি মেশিনগান আর একটি ৭৫ মিলিমিটার-বিধ্বংসী ছোট কামান। অলি আহমদসহ যোদ্ধারা যুদ্ধে গেরিলা কৌশল অবলম্বন করলেন। স্থানীয় জনগণের সহযোগিতায় গোপনে রাস্তার দুই পাশে বাংকার তৈরি করে সেখানে অবস্থান নিলেন।

১৯ এপ্রিল ভোরে কোম্পানি কমান্ডার হিসেবে ক্যাপ্টেন অলি আহমদ নায়েক ফয়েজ আহমেদকে সঙ্গে নিয়ে আক্রমণের প্রস্তুতি পরিদর্শন করতে গিয়ে দেখলেন, প্লাটুন কমান্ডার সিরাজুল ইসলাম ও প্লাটুন হাবিলদার স্ব স্ব বাংকারে নেই। খবর দিয়ে দ্রুত তাদের অবস্থানে ফিরিয়ে আনা হয়। প্রস্তুতি শেষ করে ঢাকা-চট্টগ্রাম প্রধান সড়কে উঠেই চমকে গেলেন ক্যাপ্টেন অলি আহমদ।

দেখলেন, একটি মাইক্রোবাস আসছে। তার একটু পেছনে একটি সাধারণ ৩ টনি ট্রাক। তার একটু পেছনেই সারিবদ্ধভাবে আসছে ২০টি সামরিক ট্রাকের বহর। প্রতিটিই সৈন্যবাহী ট্রাক। তিনি দ্রুত আড়ালে গেলেন। পুরো শত্রুবাহিনী তাদের অবস্থানে ঢুকে পড়তেই ক্যাপ্টেন অলি আহমদ ফায়ার ওপেন করলেন। দ্বিতীয় ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্ট থেকে ধার করা ৭৫ মিলিমিটার-বিধ্বংসী কামান দিয়ে তিনি সবচেয়ে পেছনের ট্রাকটি ধ্বংস করে দেন। হাবিলদার সিদ্দিক মর্টার ফায়ার করে সামনে ও মাঝখানের তিনটি সামরিক ট্রাক উড়িয়ে দেন। অধিকাংশ শত্রুসেনা নিজ গাড়ির মধ্যেই নিহত হয়। যুদ্ধের একপর্যায়ে শত্রুবাহিনীর গুলিতে হাবিলদার সিদ্দিক আহত হন। ল্যান্সনায়েক আবুল কালামও অতর্কিত এক মর্টার শেলের আঘাতে ঘটনাস্থলেই শহীদ হন। এ সময় আরও চারজন মুক্তিযোদ্ধা আহত হন। এ যুদ্ধে সাহসী ভূমিকা রাখার জন্য বাংলাদেশ সরকার ক্যাপ্টেন অলি আহমদকে বীর বিক্রম খেতাব প্রদান করে।

১৯৭১ সালে অলি আহমদ কর্মরত ছিলেন পাকিস্তান সেনাবাহিনীর অষ্টম ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টে। এর অবস্থান ছিল চট্টগ্রামের ষোলশহরে। ২৫ মার্চ মধ্যরাতে ঝাঁপিয়ে পড়েন মুক্তিযুদ্ধে। প্রতিরোধযুদ্ধ শেষে ভারতে পুনরায় সংগঠিত হওয়ার পর নিয়মিত মুক্তিবাহিনীর জেড ফোর্সের অধীনে যুদ্ধ করেন। স্বাধীনতার পর তিনি বাংলাদেশ সেনাবাহিনীতে কর্নেল পদে উন্নীত হয়ে অবসর নেন।

জিয়াউর রহমান বিএনপি গঠন করলে তিনি সেনাবাহিনীতে তার চাকরি ছেড়ে রাজনীতিতে যোগ দান করেন। তখন তার আরো ৯ বছর চাকরি ছিল। এরশাদ সরকারের বিরুদ্ধে আন্দোলনে তিনি সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করেন। ১৯৯১ সালে বিএনপি সরকার গঠন করলে তিনি যোগাযোগ মন্ত্রী হন। যমুনা সেতুর কাজ তার সময়েই শুরু হয়। বিএনপিতে তিনি জাতীয় স্থায়ী কমিটির সদস্য ছিলেন। দীর্ঘকাল বিএনপির রাজনীতিতে যুক্ত থাকার পর ২০০৬ সালের ২৬ অক্টোবর তিনি লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টি গঠন করেন। নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে তিনি এলডিপি থেকে এককভাবে নির্বাচনে অংশ নিয়ে তিনি এমপি নির্বাচিত হন। এরআগেও তিনি ছয়বার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন।

কর্নেল অলি আহমদ বর্তমানে লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টি-এলডিপি’র প্রেসিডেন্ট, জাতীয় মুক্তিমঞ্চের আহ্বায়ক ও ২০ দলীয় জোটের প্রধান সমন্বয়ক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।

লেখক: মুক্তিযুদ্ধা ও রাজনীতিবীদ, প্রেসিডিয়াম সদস্য লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টি-এলডিপি।

Facebook Comments

Check Also

করোনাকালের মানবিক সংকটে একজন  ড. সালেহা কাদের 

আলিশা আরিয়ান : বিশ্বব্যাপী করোনাভাইরাস এখন মানুষের অভিন্ন শত্রু। এই ভাইরাস গত পাঁচ মাসে বিশ্ববাসী …

vv