ব্রেকিং নিউজঃ
Home / বাংলাদেশ / জাতীয় / মানুষের জন্য কাজ করে আনন্দ পাই : পুলিশ সুপার সামছুন্নাহার

মানুষের জন্য কাজ করে আনন্দ পাই : পুলিশ সুপার সামছুন্নাহার

রাশেদ শাহরিয়ার পলাশ : আপনার প্রিয় ব্যক্তি কে? প্রশ্ন করতেই চোখ ছলছল করে উঠে। ভেজা চোখে কন্ঠে আর্দতা নিয়ে বলছিলেন তিনি। ’ আমি তখন বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ি। হলে থাকি। খবর এলো দাদা নেই। কিসের উপর দিয়ে গ্রামের বাড়ি ফরিদপুরে ছুটে গেছি। নিজেও জানি না।’ কথা হচ্ছিল চাঁদপুরের পুলিশ সুপার সামছুন্নাহারের সঙ্গে। তিনি একটি একান্ত স্বাক্ষাৎকারদেন বার্তা সংস্থা ইউএনবিকে। তাঁর স্বাক্ষাৎকার গ্রহণ করেন ইউএনবির ডিস্ট্রিক এডিটর (ন্যাশনাল ডেস্ক ইনচার্জ) সাংবাদিক রাশেদ শাহরিয়ার পলাশ। এর কিছু চুম্বক অংশ তুলে ধরা হলো।

চাঁদপুরের মানুষের সমসাময়িক অবস্থা, সামাজিক অবস্থা এবং তাঁর নানা কর্মসূচী নিয়ে খোলামেলা কথা বলেন তিনি। উঠে আসে ব্যক্তিগত প্রসঙ্গও। নিম্মে তা তুলে ধরা হলো।

চাঁদপুরে যোগদানের শুরুতেই একটা প্রশ্ন সামনে চলে আসে। পরিচিতি সভায় সাংবাদিকরাও প্রশ্ন তুলেন। তিনি পারবেন তো? বলছিলেন তিনি। তাঁর জবানিতেই শোনা যাক তাঁর কথা-

’আমি সাংবাদিকদের প্রথম পরিচিতি সভায় জানিয়ে দেই আমাকে মহিলা এসপি হিসেবে নয়, এসপি হিসেবে দেখবেন। তাতেই অনেক সমস্যার সমাধান হয়ে যায়। আমি বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময় বিভিন্ন সংগঠন করেছি।

স্বাক্ষাৎকার নিচ্ছেন রাশেদ শাহরিয়ার পলাশ। এ সময় ইউএনবির চাঁদপুর প্রতিনিধি প্রফেসর দেলোয়ার আহমেদ এবং কমিউনিটি পুলিশের সদর উপজেলা সভাপতি সালেহ উদ্দিন আহমেদ জিন্নাহ উপস্থিত ছিলেন।

আমার বাবা ছিলেন রাজনৈতিক নেতা (উপজেলা চেয়ারম্যান)। ফলে ঐ সময়ই বিভিন্ন পরিস্থিতির সঙ্গে খাপ খাইয়ে চলার মানসিকতা তৈরী হয়েছে। এমনও দেখা গেছে, আগামীকাল পরীক্ষা। কিন্তু বাসায় এত লোক যে পড়ার জায়গা খুঁজে পাচ্ছি না। আবার হয়তো খেতে গিয়েছি দেখা গেল খাবার দিয়ে অতিথি আপ্যায়ন হয়ে গেছে। ফলে যে কোনো পরিস্থিতিতে খাপ খাওয়ানোর অভিজ্ঞতা তখনই হয়ে গিয়েছিলো। আবার বিভিন্ন সংগঠন করায় নেতৃত্ব দেয়ার প্রশিক্ষণ সেখানেই হয়ে গিয়েছিলো।’

আমরা প্রশ্ন করি, নারী ও শিশু সহায়তা সেল নিয়ে। পরিতৃপ্তির ঝিলিক তাঁর চোখে মুখে। ” প্রথম আমরা ছোট আকারে শুরু করি। এখন এর পরিসর বড়। আমাদের সিনিয়র লেভেলের বেশ কয়েকজন অফিসার এতে সম্পৃক্ত। অভিযোগ পেলে প্রথমে শুনানি করি। পরপর তিন শুনানিতে সমাধান না হলে আদালতে পাঠিয়ে দেই। এ পর্যন্ত প্রায় ২৭ শত অভিযোগের নিষ্পত্তি হয়েছে। সিদ্ধান্ত যার বিরুদ্ধে যায় সে হয়ত ক্ষুব্ধ হয়। কিন্তু সমাধান করতে পেরে আমি খুশি। ”

এক সময় কিছু আইনজীবি আপনার এই অভিযোগ নিষ্পত্তি নিয়ে প্রশ্ন তুলেছিলো। এ ব্যাপারে আপনার অবস্থান কি? আইনজীবিদের প্রতিপক্ষ হয়ে উঠছেন না?

স্বভাব সুলভ স্মিত হাসি তাঁর চোখে মুখে। ’এটা আমি কখনোই মনে করি না। আমি আদালত বসাই না। আমি প্রথম আসার পর থেকে অনেকেই নানা সমস্যা নিয়ে আসতে শুরু করে। যখন আমার একটি পদক্ষেপে তারা সমাধান পেয়ে যায় তখন আরো আসতে থাকে। আর আমি যেহেতু মহিলা তাই মহিলারা বা মেয়েরা আমার সাথে কথা বলে সাচ্ছন্দ্য বোধ করে। আর আমরা যে সব সমস্যার আপোষ করতে পারি না, তাদের তো আমরা আদালতে পাঠিয়ে দেই।’

কৌতহলী আমরা প্রশ্ন করি। তাহলে পুরুষরা কোথায় যাবে? তাদের সমস্যা নিয়ে? তিনি হাসেন। সাথে চলে আপ্যায়ন । পুরুষরাও আসে। সে সংখ্যা শতকরা ২/৩ ভাগ।

মাদক নিয়ে সোচ্চার এই চৌকষ নারী পুলিশ কর্মকর্তা। যদিও নারী নামে আলাদা করতে তাঁর ঘোর আপত্তি। তিনি নিজেকে একজন পুলিশ কর্মকর্তা বলতে বরং বেশী সচ্ছন্দ বোধ করেন। তিনি দেখেছেন শুধু অভিযান করে, কঠোরতা করে আশারনুরূপ সাফল্য পাচ্ছিলেন না। তাই উদ্যোগ নেন তরুন সমাজের মানষিকতা কে ঘুরিয়ে দিতে। জেলা জুড়ে তিনি প্রায় ১২০০ ফুটবল ম্যাচ আয়োজন করেন। গ্রাম বা শহরের প্রতি ওয়ার্ডে ওয়ার্ডে খেলা হয়েছে। হয়েছে ইউনিয়ন পর্যায়ে। তারপর উপজেলা হয়ে পরে জেলা। গ্রামে গ্রামে ফুটবল উৎসব ছড়িয়ে দেন তিনি।

সাংবাদিকরা নাকি হাসি মূখে খুব কঠিন প্রশ্ন করে। আমরাও পিছিয়ে থাকি কি করে! স¦াভাবিক প্রশ্ন চলে আসে। এত যে ম্যাচ আয়োজন টাকা আসে কোথা থেকে? পুলিশের কি এই ফান্ড আছে?

না! হাসিতেই উত্তর ফিরিয়ে দেন তিনি। প্রথম প্রথম এ নিয়ে দুশ্চিন্তায় ছিলাম। চেয়ারম্যান, কমিশনার, মেম্বাররা এগিয়ে এসে আমার চিন্তা কমিয়ে দেয়। স্বতঃ স্ফুর্ত ভাবে সবাই এগিয়ে আসে।

রাজনৈতিক ভাবে কোনো সমস্যায় পড়েন না? আমাদের কৌতুহলী মন প্রশ্নের ধার বাড়ায়। না! সহজ সরল উত্তর দেন তিনি। ’যেখানে গুরুত্বপূর্ণ খেলা হয় আমি ঐ এলাকার রাজনৈতিক নেতা, এমপি মহোদয়গনকে রাখি। এটা সম্মিলিত একটা প্রয়াস। সবাইকে নিয়ে কাজ করলে কাজে গতি বাড়ে।’

সময় ফুরায়। আমদের আলাপ শেষ হয় না। ইত্যিমধ্যেই ঘড়ির কাটা জানান দিচ্ছে ২ ঘন্টা শেষ। তবুও কৌতুহল জাগে। কারন সকাল ৯টায় তিনি মতলব উত্তরে গিয়েছেন। ৬ টায় ফিরেছেন। আমাদের সাথে সময় দেয়া ছিলো ৬ টায়। এই যে সময়ানুবর্তিতা । কিভাবে সম্ভব? হাসেন তিনি। আমি ভোরেই ঘুম থেকে উঠি। মেয়েকে নিয়ে স্কুলে যাই। অন্য দশটা মায়ের মত অন্য মায়েদের সাথে গল্প করি। এর পর শুরু হয় কাজ।

ব্যক্তিগত কথা চলে আসায় আমরাও ব্যক্তিগত প্রশ্ন করার সুযোগ পেয়ে যাই। কে বেশী সহায়াতা করে। পরিবার থেকে। নির্দিধায় বলে দিলেন আমার স্বামী। সে আমার ভালো বন্ধু। আমার কোনো কিছুই করতে হয় না। বলতে পারেন আমার মনোবল সেই বাড়িয়ে দিচ্ছে।

এই যে কাজ করেন। ভালো খারাপ হাজারো লোক নিয়ে আপনার পথ চলা। দিনশেষে কি মনে হয় আপনার ? একটা পরিতৃপ্তির হাসি। চোখে আনন্দাশ্রু। রাতের আলোয় চিক চিক করে ওঠা চোখ মুছতে হাত বাড়িয়ে টিস্যু নেন। যখন দেখি একজন স্ত্রী তার স্বামীকে ফিরে পায়। বাচ্চারা তার বাবাকে এক সাথে দেখে তখন আনন্দটা বেড়ে যায়। মনে হয় আজ একটা ভালো কাজ করতে পারলাম। মানুষের জন্য কাজ কওে আনন্দ পাই।

দিনশেষে সুখাানুভূতি কি? ’যখন আমার মেয়েটা আমরা বুকের উপর শুয়ে ঘুমায়’ উচ্চ হাসিতে ফেটে পরেন তিনি। ঢাকার লঞ্চ ধরতে হবে। তাই নিজেদের উসখুস বিদায় নেয়ার জন্য। কিন্তু এই পুলিশ কর্মকর্তা তাঁর উদারতার শেষ উদাহরণটুকু দেখান।

এই যে এদের দেখছেন (ততক্ষনে বিভিন্ন ফাইল নিয়ে কয়েকটি থানার ওসি, ডিবির ওসি. এসআইসহ অফিসের কর্মকর্তাগণ দাড়িয়ে) এদের সবার প্রচেষ্টায় সাফল্য আসছে। কোনো অপরাধের অভিযোগ পেলে ছাড় দেই না। কাজে এবং চিন্তায় আজীবন সৎ ছিলাম থাকবো। দৃঢ় কন্ঠে জানান দেন তিনি।

লেখক : বার্তা সংস্থা ইউএনবির ডিস্ট্রিক এডিটর (ন্যাশনাল ডেস্ক ইনচার্জ)। স্বাক্ষাৎকারটি গ্রহনের সময় ইউএনবির চাঁদপুর প্রতিনিধি প্রফেসর দেলোয়ার আহমেদ এবং কমিউনিটি পুলিশের সদর উপজেলা সভাপতি সালেহ উদ্দিন আহমেদ জিন্নাহ উপস্থিত ছিলেন।

Facebook Comments

Check Also

চাঁদপুরে সিএনজি অটোরিকশা মালিক সমিতির নামে চাঁদা আদায় কালে আটক-২

স্টাফ রিপোর্টার : চাঁদপুর শহরে সিএনজি চালিত অটোরিকশা মালিক সমিতির নামে চাঁদাবাজির অভিযোগে  চাঁদপুর মডেল …

vv