ব্রেকিং নিউজঃ
Home / মতামত / মাঠ নেই, চার দেয়ালে আটকে যাচ্ছে নতুন প্রজন্ম

মাঠ নেই, চার দেয়ালে আটকে যাচ্ছে নতুন প্রজন্ম

প্রিয় চাঁদপুর রিপোর্ট : আধুনিক নগর জীবনে পার্ক ও মাঠকে বলা হয় ‘নগরের ফুসফুস’। এ হিসেবে রাজধানী ঢাকার ফুসফুস যে খুবই দুর্বল, তা বলার অপেক্ষা রাখে না। গত দুই দশকে ঢাকার দুই-তৃতীয়াংশ মাঠ সম্পূর্ণ হারিয়ে গেছে, অনেক মাঠের আংশিক বেদখল হয়ে গেছে। কেউ ওড়াচ্ছে কাগজের ঘুড়ি, কারো হাতে ব্যাট, কারো পায়ে বল আবার কেউবা লাফাচ্ছে অকারণে। বিকেলটা কীভাবে ফুরিয়ে যাচ্ছে, সেদিকে কারো যেন হুঁশ নেই। দুই দশক আগে রাজধানীর খেলার মাঠগুলোর চিত্র এমন থাকলেও বর্তমানে প্রজন্মের শৈশব থেকে তা লাপাত্তা হয়েছে। কারণ স্কুল, পাড়া বা মহল্লায় দুরন্তপনায় মেতে ওঠার মতো কোনো জায়গা নেই। পিঠে ভারী ব্যাগ।

চোখে বড় হওয়ার স্বপ্ন। শুধু ডাক্তার-ইঞ্জিনিয়ার নয়, স্বপ্ন এখন সাকিব আল হাসান বা শচীন টেন্ডুলকার হওয়ারও। কিন্তু কীভাবে পূরণ হবে সেই স্বপ্ন? চিত্তবিনোদনের জন্য খেলার মাঠ সংকুচিত হয়ে পড়ায় শিশু-কিশোররা বন্দি হয়ে পড়ছে চার দেয়ালের মধ্যে, আটকে যাচ্ছে টিভি-কম্পিউটার ও ভিডিও গেমসে। অপরাধ বিশ্লেষকদের মতে, খেলাধুলা ও সামাজিকীকরণের সুযোগ কমে যাওয়ায় শিশু ও কিশোরদের মধ্যে অপরাধ প্রবণতা বৃদ্ধি পাচ্ছে। এ থেকে পরিত্রাণের উপায় বিষয়ক আলোচনা নিয়ে হাজির হয়েছে এবারের ‘প্রজন্ম’। সম্পাদনা করেছেন রিয়াদ খন্দকার ও গ্রন্থনায় সৈয়দ তাওসিফ মোনাওয়ার, ছাইফুল ইসলাম মাছুম, জাহিদ হাসান দীপু, মাসরুবা তাসমিন সুহা

‘খেলাধুলার অভাবে পরাজয়কে মেনে না নেওয়ার মানসিকতা বৃদ্ধি পায়’

—অধ্যাপক ডা. মোহিত কামাল

মনোরোগ বিশেষজ্ঞ

আমাদের শারীরিক ও মানসিক বিকাশের জন্য খেলাধুলা খুবই প্রয়োজনীয়। খেলাধুলা করলে মাসলের মুভমেন্ট হয়, রক্ত সঞ্চালন বাড়ে। খেলাধুলা মস্তিষ্ক ও মনকে সতেজ রাখে। যখন বাচ্চারা খেলাধুলা না করে ঘরে বসে থাকে, তখন তাদের এই রক্ত চলাচল ক্ষতিগ্রস্ত হয়। যে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা নিয়ে বড় হওয়ার কথা, যে মানসিক শক্তি তৈরি হওয়ার কথা তা ক্ষতিগ্রস্ত হয়। আমরা ছোটবেলায় খেলায় গোল দিয়েছি, গোল খেয়েছি। এ থেকে জয়ের মতো হারকেও বরণ করার শিক্ষা পেয়েছি। কিন্তু এখনকার ছেলেমেয়েরা হার মেনে নিতে পারে না। তারা ব্যর্থ হলে ভেঙে পড়ে। পরিস্থিতি মোকাবিলা করার ক্ষমতা লোপ পায়। কঠিন পরিস্থিতি সহজে সামাল দিতে পারে না। ফলে তাদের মানসিক রোগে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি বাড়ে।

আমরা লুডু খেলেছি, টেবিল টেনিস খেলেছি, ব্যাডমিন্টন খেলেছি। সাপলুডু খেলতে গিয়ে গুটি সাপের ঘরে পড়ে ৯৯ থেকে ৫-এ চলে এলে আমরা চিত্কার করতাম। কিন্তু খেলা বাদ না দিয়ে আবার চেষ্টা করতাম। এতে টলারেন্স লেভেল ডেভেলপ করেছে। এখনকার ছেলেমেয়েদের মধ্যে সেই প্রবণতা নেই। তারা সারাক্ষণ ফোনে আর কম্পিউটারে ব্যস্ত থাকছে। তারা সামনাসামনি কথা বলে না, বসে বসে ফেসবুকে মেসেজ পাঠায়। যার ফলে তারা কিছুটা অন্তর্মুখী হয়ে যাচ্ছে, সামাজিক ও পারিবারিকভাবে ডিসকানেকটেড হয়ে যাচ্ছে। পারিবারিকভাবে বিছিন্ন হলে তাদের যেকোনো অশুভ কাজের ফাঁদে পড়ার আশঙ্কা বৃদ্ধি পায়। সামাজিকভাবে বিচ্ছিন্ন হলে মানবিক দক্ষতাগুলো আর শাণিত হয় না। পরাজয় মেনে নেওয়ার মানসিকতা হারিয়ে যাওয়ার ফলে অল্পতেই রিঅ্যাক্ট করার প্রবণতা বৃদ্ধি পায়। অথচ পরাজয়কে বরণ করাও একটা বড় জয়। আমরা হারব, আবার নতুন করে চেষ্টা করব, এটাই তারুণ্য, এটাই শক্তি। সামনে এগিয়ে যাওয়ার নামই জীবন।

‘প্রত্যেক ভবনে খেলার জন্য অন্তত একটা ফ্লোর বাধ্যতামূলক রাখতে হবে’

—অধ্যাপক ড. নেহাল করিম

চেয়ারম্যান, সমাজ বিজ্ঞান বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

বিজ্ঞান প্রযুক্তির অনেক উন্নতি হয়েছে। মানুষের ক্রয় ক্ষমতা বেড়েছে। ঘরে ঘরে বেড়েছে পড়ালেখা জানা মানুষের সংখ্যা। এখন স্মার্ট ফোনের যুগ চলছে, পৃথিবীটা চলে এসেছে হাতের মুঠোয়। দশ বছর আগেও সবার হাতে স্মার্ট ফোন ছিল না। তারও আগে প্রচুর খেলার মাঠ ছিল, প্রচুর জায়গা ছিল। শহরটা এত বড় ছিল না। তখন আমরা খেলার সময় পেয়েছি। এখন প্রযুক্তির উন্নয়নের কারণে সময়ও কমেছে। আকাশ সংস্কৃতি ও স্মার্ট ফোন আমাদের সময় কেড়ে নিয়েছে।

এখন একদিকে খেলার মাঠ নেই, সময়ও নেই। অন্যদিকে খেলার ইচ্ছাও নেই। মাঠের খেলার চেয়ে তরুণ প্রজন্ম এখন স্মার্ট ফোনের খেলায় বেশি আসক্ত। এর ফলে আমরা আত্মকেন্দ্রিক হয়ে যাচ্ছি। আমাদের আশপাশের প্রকৃতিকে চিনছি না, বিশ্বকে চিনছি না। প্রকৃতির বাতাস আমাদের গায়ে লাগছে না। এর কারণে মনের বিকাশ হচ্ছে না, আবার শারীরিক বিকাশও বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। একাকিত্বের কারণে অনেকে অপরাধপ্রবণ হয়ে পড়ছে। তথ্যপ্রযুক্তি বিষয়ে অধিকাংশ অভিভাবকের ধারণা কম থাকায় সন্তানদের মনিটরিংও করতে পারছেন না। এই অবস্থা থেকে উত্তরণের জন্য সরকারের উচিত পলিসি হাতে নেওয়া। এখন থেকে যত নতুন ভবন নির্মাণ হবে, প্রত্যেক ভবনে শিশুদের খেলার জন্য অনন্ত একটা ফ্লোর বাধ্যতামূলক রাখতে হবে। মা-বাবার উচিত অবশ্যই সন্তানদের সময় দেওয়া। অনন্ত সন্তানদের সাথে বসে একবেলা খাবার খাওয়া। আপনারা খেয়াল করলে দেখবেন, ৭৫ বছর ৮০ বছর বয়স্ক অনেক মানুষ আছে, কারো সহযোগিতা ছাড়াই তারা চলতে পারে। তাদের জিজ্ঞাসা করলে জানতে পারবেন, তারা ছোট বেলায় দৌড়ঝাঁপ করেছে, সাঁতার কেটেছে, খেলাধুলা করেছে। তাই বলা যায়, শেষ বয়সে সুস্থ-সবল থাকার জন্য ছোটবেলায় খেলাধুলা খুব জরুরি।

‘গ্যাজেটভিত্তিক নয়, বরং করতে হবে বাস্তব জীবনভিত্তিক পুরস্কার ব্যবস্থা’

—রুদমিলা মাহবুব

প্রভাষক, ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়

মানুষ সামাজিক জীব। আর তাই একজন মানুষের সমাজে টিকে থাকার জন্য তার পূর্ণাঙ্গ সামাজিকীকরণ অতীব প্রয়োজনীয়। এই সামাজিকীকরণের প্রক্রিয়ায় খেলাধুলা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। একক বা দলগত যেকোনো খেলাই শেখায় ধৈর্য, নিয়মানুবর্তিতা, পারস্পারিক শ্রদ্ধাবোধসহ আরও অনেক বিষয়। ফলে দেখা যায়, একজন ব্যক্তির পূর্ণাঙ্গ শারীরিক ও মানসিক বিকাশের জন্য খেলাধুলার ভূমিকা অনস্বীকার্য। তথ্য প্রযুক্তির কল্যাণে আজকাল খেলার ধরনে যখন তৈরি হচ্ছে ভিন্ন প্রেক্ষাপট তখন প্রশ্ন আসে, প্রযুক্তি কি আমাদের দ্বারা নিয়ন্ত্রিত নাকি আমরা প্রযুক্তির দ্বারা। অত্যন্ত দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্য যে, এখন বাচ্চারা নব্বই দশকের যেকোনো বাচ্চার চেয়ে অনেক বেশি স্মার্ট হওয়া সত্ত্বেও শৈশব বা কৈশোরের দুরন্তপনা বর্জিত জীবনে অতিমাত্রায় অভ্যস্ত। মাঠে গিয়ে ছোটাছুটির চাইতে ঘরে বসে গ্যাজেটে খেলার মধ্যে তারা অধিক স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করে। কারণ তাদের বাবা-মা মাঠে গিয়ে অন্য বাচ্চাদের সাথে খেলার চাইতে ঘরের চার দেয়ালের সংকীর্ণতাকে সন্তানের জন্য অধিক নিরাপদ মনে করেন। মূলত মা বাবার এ ধরনের মানসিকতা তাদের সন্তানের জন্য তৈরি করে এক অনিশ্চিত ভবিষ্যত্। কারণ একজন বাচ্চা অন্য বাচ্চাদের সাথে মিশে পারস্পারিক ভাবের আদান-প্রদানের মাধ্যমে নিজেদের মধ্যে যে সৌহার্দ্যপূর্ণ সম্পর্ক তৈরি করতে পারত, তা তৈরি না হওয়ার দরুন প্রাধান্য দিচ্ছে ব্যক্তিস্বার্থকে। মূলত প্রযুক্তির ভয়াবহতা থেকে বেরিয়ে আসতে হবে, এগিয়ে আসতে হবে আমাদের সবাইকে। এক্ষেত্রে পিতা-মাতাকে রাখতে হবে অগ্রণী ভূমিকা। সন্তানকে দিতে হবে সামাজিকীকরণের পরিবেশ। গ্যাজেটভিত্তিক নয়, বরং করতে হবে বাস্তব জীবনভিত্তিক পুরস্কার ব্যবসা। সকলের সাথে কাজ করার আনন্দ যে গ্যাজেটে পুরস্কার প্রাপ্তির চাইতে অনেক বেশি রোমাঞ্চকর তার পরিচয় ঘটাতে হবে সন্তানের সাথে। তাহলেই আমরা পারব একটি সুস্থ শিশু যে গঠন করে নতুন বাংলাদেশ।

‘ভার্চুয়াল জগতে সকলেই পছন্দের খেলাকে নিজের হাতের মুঠোয় নিয়ে আসতে পারছে’

—শেখ সাঈদ আহমেদ

শিক্ষার্থী, সিএসই ডিপার্টমেন্ট, ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি

সময়ের পরিবর্তনের সাথে সাথে খেলাধুলার ধরনের পরিবর্তন আসবে, এটাই স্বাভাবিক। ছোটবেলায় আমাদের খেলার জন্য একটা নির্দিষ্ট জায়গা কিংবা বাসার কাছেই কোনো না কোনো মাঠ থাকত, যেখানে সবাই খেলতে পারতাম। এখনকার ইট-পাথরের শহরে ছোটদের খেলার স্থান তো দূরের কথা, সকলের জন্য উন্মুক্ত মাঠের সংখ্যাও অতি সামান্য। আর যাও আছে, তাও চলে যাচ্ছে বিভিন্ন সংগঠন কিংবা ক্লাবের অধীনে। এলাকার সাধারণ মানুষের ব্যবহারের সুবিধা কমে আসছে ধীরে ধীরে। ব্যবহার হচ্ছে বিভিন্ন মেলা, অনুষ্ঠান কিংবা টুর্নামেন্ট আয়োজনের কাজে। ফলে শিশুদের খেলাধুলার স্থান হয়ে উঠেছে এলাকার অলিগলি আর রাস্তাগুলো। আর সঙ্গত কারণেই ঘটছে নানাবিধ দুর্ঘটনা। তাই মাঠের অভাবে শিশুকাল থেকেই বাচ্চারা হয়ে পড়ছে ঘরমুখো।

মাঠ না থাকলেও শিশুদের থেকে শুরু করে তরুণদের খেলাধুলা কিংবা বিনোদনের এই অভাব পূরণ করছে প্রযুক্তি। ভার্চুয়াল জগত্ আর বাস্তব জগতের মধ্যকার পার্থক্য কমে আসছে প্রযুক্তির কল্যাণে। আর তাই মাঠের আধিক্য অথবা অভাব কিংবা মাঠে খেলতে পারা বা না-পারার সব আনন্দ, বিনোদন আর কষ্টকে ছাপিয়ে শহুরে শিশু-কিশোর আর তরুণ প্রজন্মের কাছে বিনোদনের সবচেয়ে সফল মাধ্যম ভার্চুয়াল গেমস। কম্পিউটার কিংবা মুঠোফোনে থাকা গেমসগুলোই আস্তে আস্তে হয়ে উঠছে তাদের সবথেকে ভালো বন্ধুু। শারীরিক কসরত কিংবা খেলতে পারা বা না-পারার কোনো বালাই নেই এখানে। সকলেই পারছে নিজেরদের পছন্দের খেলাকে নিজের হাতের মুঠোয় নিয়ে আসতে।

‘প্রযুক্তিনির্ভর গেমসের আসক্তি কমাতে সামাজিক সচেতনতা বাড়াতে হবে’

—আফসানা আলম প্রীতি

শিক্ষার্থী, সাংবাদিকতা বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

আমরা যখন গ্রামে শৈশব কাটিয়েছি, তখন দেখেছি বাচ্চারা মাঠে খেলত। মেয়েরা কানামাছি, পুতুল খেলা খেলত। আমি নিজেও ছোটবেলায় কানামাছি, হাঁড়ি-পাতিল, পুতুল বিয়ে খেলেছি।

এখন প্রযুক্তির কারণে বাচ্চারা মাঠের বদলে ট্যাবে কিংবা স্মার্ট ফোনে গেমস খেলছে। টেলিভিশনে কার্টুন দেখে সময় ব্যয় করছে। আগে তরুণেরা দল বেঁধে টুর্নামেন্ট আয়োজন করত, ক্রিকেট, ফুটবল, হা-ডু-ডু খেলত। এখন একদিকে তরুণেরা খেলার জন্য জায়গা পাচ্ছে না, অন্য দিকে তাদের চিন্তাও বড় পরিবর্তন এসেছে। তারা আসক্ত হয়ে পড়ছে স্মার্ট ফোনের খেলায়। এখন স্মার্টফোন অ্যান্ড্রয়েড ফোনের জগতে সবচেয়ে বেশি জনপ্রিয় খেলার মধ্যে রয়েছে অ্যাসফ্যালট, রিয়াল রেসিং, ক্ল্যাশ অব ক্লানস, ডটস, গ্যালাক্সি অন ফায়ার। আমাদের বয়সী অনেকে এসব খেলায় অনেক বেশি আসক্ত। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তরুণেরা সবচেয়ে বেশি সময় ব্যয় করছে, সেই ফেসবুকও ব্যবহারকারীদের জন্য অনেক খেলার সুযোগ তৈরি করে রেখেছে। আগে মাঠে ময়দানে খেললে যে অনেকের সাথে সামাজিক বন্ধুত্ব তৈরি হতো, নেটওয়ার্ক তৈরি হতো, এখন সেই সুযোগ নেই। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম আমাদের অসামাজিক করে তুলছে। প্রযুক্তিতে আসক্ত তরুণেরা সমাজ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ছে, একা হয়ে যাচ্ছে। এতে তাদের মানসিক স্বাস্থ্যে খুব খারাপ প্রভাব পড়ছে। একটা সময় একাকিত্ব ও হতাশার কারণে অনেকে আত্মহত্যার পথও বেছে নিচ্ছে। খেলার ধরন পাল্টানোর কারণে যে সমস্যা তৈরি হয়েছে, এর কোনো সহজ সমাধান নেই। এর পিছনে সামাজিক সংকট দায়ী। প্রযুক্তিনির্ভর গেমসের আসক্তি কমাতে সামাজিক সচেতনতা বাড়াতে হবে। সরকারকে শারীরিক খেলার প্রতি তরুণদের উত্সাহিত করতে কাজ করতে হবে। খেলার মাঠ দিতে হবে।

‘ভার্চুয়াল গেমে সামাজিক মূল্যবোধ বিকাশের সুযোগ নেই’

—মোহাম্মদ নওরোজ ইকবাল নাঈম

ক্রিকেটার

সময়ের পরিবর্তনের সাথে সাথে পাল্টে যাচ্ছে মানুষের খেলাধুলার মাধ্যম। আগে যেখানে খেলাধুলা মানেই ছিল বিকেলবেলা খেলার মাঠে খেলাধুলা করা, সেখানে এখন তা এসে দাঁড়িয়েছে মোবাইল কিংবা কম্পিউটারের মনিটরের উপরে। মূলত শহুরে শিশু-কিশোরদের খেলাধুলার মাধ্যমের পরিবর্তনের পিছনের মূল চালিকা শক্তি হিসেবে কাজ করেছে খেলার স্থান কিংবা মাঠের অভাব। শহরগুলোর জনসংখ্যা যেখানে এত বেশি সেখানে শিশু-কিশোরদের সুস্থ মানসিক বিকাশের জন্য দরকার খোলা পরিবেশ, নির্মল বায়ু আর খেলার মাঠের, সেখানে খোলা পরিবেশ কিংবা খেলার মাঠের দেখা পাওয়াই ভার। শহরের ভিতরের হাতে গোনা যেসব মাঠ আছে তাঁর অধিকাংশই বিভিন্ন ক্লাব কিংবা সংগঠন কিংবা প্রতিষ্ঠানের অধীনে। ফলে এগুলোতে প্রবেশাধিকার পাচ্ছে না নগরীর সাধারণ জনগণ বা শিশু-কিশোররা। খেলার মাঠের অভাব এসকল শিশু-কিশোর একরকম ঘরমুখো হয়ে যেতে বাধ্য করছে। এতে বিঘ্ন ঘটছে তাদের মানসিক বিকাশের। তাছাড়া খেলার মাঠের অভাবে শিশু-কিশোরদের শারীরিক কসরতেও ভাটা পড়ছে। মানসিক বিকাশের পাশাপাশি ব্যাহত হচ্ছে শারীরিক বিকাশও। ফলে শিশু-কিশোর আসক্ত হয়ে পড়ছে নিজেদের হাতের নাগালে থাকা ইলেকট্রনিক ডিভাইস এবং ভার্চুয়াল গেমিংয়ের দিকে। ভার্চুয়াল গেমিংই বর্তমান সময়ে শিশু-কিশোর তথা তরুণ প্রজন্মের বিনোদনের অন্যতম প্রধান উত্স। পাবজি, সিওসি, নিড ফর স্পিড কিংবা ফিফার মতো ভার্চুয়াল গেমগুলো এই প্রজন্মের মানসিক বিকাশে কিছুটা সাহায্য করলেও শারীরিক বিকাশ কিংবা সামাজিক মূল্যবোধের বিকাশ সম্পর্কিত বিষয়গুলো এই মাধ্যমের সক্ষমতার বাইরে। তাই অভিভাবকদের কাছে আমার আবেদন, শিশু-কিশোরদের শুধু পড়ালেখার ওপর নজর না দিয়ে তাদের খেলাধুলা করার সময় বের করে দেওয়া, খেলতে পাঠানো কিংবা খোলা পরিবেশে যেতে দেওয়ার সুযোগ করে দেয়ার প্রতিও নজর রাখুন।

‘খেলার আনন্দটুকু আজ হাতের মুঠোয় থাকা চারকোনা স্ক্রিনে বন্দি’

—নিয়াজ মাহমুদ সজীব

শিক্ষার্থী, ফিন্যান্স বিভাগ, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়

সময়ের নিরন্তর বয়ে চলার সাথে তাল মিলিয়েছে প্রযুক্তির আধুনিকায়ন। প্রতিনিয়তই নতুন নতুন আকর্ষণীয় উদ্ভ্ভাবন প্রভাবিত করছে মানুষের দৈনন্দিন জীবনকে। প্রযুক্তি জীবনকে অনেকাংশে গতিশীল করলেও বাড়িয়েছে সীমাবদ্ধতা। ঠিক যেমন বন্ধুদের সাথে মাঠে ফুটবল খেলার আনন্দটুকু আজ হাতের মুঠোই থাকা চারকোনা স্ক্রিনে বন্দি। বিষয়টি আরও ভালোভাবে আলোচনা করা যাক। একটা সময় ছিল যখন একজন কিশোর তার বন্ধুদের সাথে ফুটবল খেলতে নিয়মিত মাঠে যেত। বন্ধুরা একসাথে অনেক হইচই করে মাঠে খেলা করত। খেলা শেষে বিজয়ীদলের উল্লাস আর পরাজিত দলের প্রতিক্রিয়ার মিশ্রণে মাঠজুড়ে এক উপভোগ্য পরিবেশ সৃষ্টি হতো। উদাহরণটি মানুষের প্রযুক্তিনির্ভরতার আগের সময়কে নিয়ে। এমন অনেক খেলা আছে যেগুলো মানুষের শারীরিক চর্চা আর ব্যায়ামের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। কিন্তু একবিংশ শতাব্দীর শুরুর দিকে অনেক খেলা মানুষের নিত্যদিনের চর্চার মধ্যে থাকলেও দ্বিতীয় দশকের অনেক শিশু-কিশোর সেসব খেলাধুলার সাথে পরিচিত নয়। গোল্লাছুট, কানামাছি ইত্যাদি খেলা এদেশের মানুষের শৈশবের এক মধুর স্মৃতি হয়ে আছে। বলাই বাহুল্য, এই খেলাগুলোর নাম বর্তমান সময়ের অধিকাংশ শিশু-কিশোরদের অজানা। খেলার মাঠে বন্ধুদের সাথে সেই আড্ডা আর অফুরন্ত খুশির মুহূর্তগুলো এখন খুঁজে পাওয়াই মুশকিল।

হাসিমাখা মুহূর্ত আর আড্ডা যে শুধুই মাঠের খেলাগুলোতেই ছিল এমনটা নয়। অনেক ঘরোয়া খেলাধুলার মধ্যেও মানুষ তার জীবনের অনাবিল আনন্দের মুহূর্তগুলো অতিবাহিত করত। তেমনই কিছু খেলা আছে যেমন লুডু, ক্যারাম কিংবা দাবা। এই খেলাগুলো চার দেয়ালের মাঝেও একটি ছোট আড্ডা বা আনন্দপূর্ণ মুহূর্ত উপহার দেয়। সেই দিনগুলোর কথা মনে পড়ে যখন দাদা, দাদি, আমি আর ছোটবোন একসাথে লুডু খেলতাম। সেই সময়গুলো আমার স্মৃতিতে সবচেয়ে দামি। হয়তো তা দাম দিয়েও পরিমাপযোগ্য নয়। তখন খেলার মাঝে এক অন্যরকম উত্তেজনা বিরাজ করত। হঠাত্ যখন দুই-তিন জন বন্ধু বাড়িতে এসে হাজির হতো তখনই ব্যস্ত হয়ে পড়তাম ক্যারাম খেলা নিয়ে। টান টান উত্তেজনার মাঝে অনেকসময় বন্ধুদের সাথে বাজিও ধরে বসতাম। দিনগুলোর কথা মনে করলে পুরো শরীরটাই আনন্দে শিহরিত হয়। তবে সেই খেলাগুলোও যেন এখন অতীতের পাতায় স্মৃতি হয়ে আছে। শুরুতেই বলেছিলাম প্রযুক্তির কথা। ঘরে বসেই যখন একজন কিশোর তার স্মার্টফোন কিংবা কম্পিউটারে বসে বন্ধুদের সাথে ফুটবল, লুডু, দাবা ও ক্যারামের মতো খেলাগুলো খেলতে পারছে তখন কেনইবা একটু পরিশ্রম করে মাঠে যেয়ে অথবা বন্ধুর বাড়িতে যেয়ে খেলবে। এমন এক অভ্যাস বর্তমান সময়ের শিশু-কিশোরদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি লক্ষ করা যায়। ফেসবুক মেসেঞ্জারে বন্ধুুদের সাথে খোশগল্পে মেতে থাকার পাশাপাশি প্রতিযোগিতামূলক ফুটবল বা বাস্কেটবল খেলার ফিচারেও তারা সমানে অংশগ্রহণ করছে। তাছাড়া সবার স্মার্টফোনে লুডু কিং, লুডু স্টার, ক্যারামের মতো অনলাইন অ্যাপ্লিকেশন তো আছেই। নির্বাকচিত্তে অনলাইনে এই খেলাগুলোতেই মানুষের অবসর সময়টা কেটে যায়। সবাই খেলাগুলো খেলতে পারে ঠিকই, কিন্তু বন্ধুরা একসাথে একইস্থানে উপস্থিত থেকে খেলার আনন্দটুকু পাওয়া কস্মিনকালেও সম্ভব নয়। এই প্রযুক্তিগুলো যেন বর্তমান প্রজন্মকে হাত-পা বেঁধে স্মার্টফোন আর কম্পিউটারের সামনে বসিয়ে রেখেছে। খোলামাঠের সুন্দর বাতাস আর শারীরিক ব্যায়ামটুকু কখনো অনলাইনের খেলার মধ্যে পাওয়া সম্ভব নয়। পরিশেষে এই প্রজন্মের সকল শিশু-কিশোর, এমনকি তাদের অভিভাবকদেরও প্রযুক্তির ব্যবহারে সচেতন হওয়ার আহ্বান জানাই।

Facebook Comments

Check Also

অনিয়ম ও দুর্নীতি প্রসঙ্গে শাহরাস্তি ইউএনও বরাবর খোলা চিঠি

বরাবর            ইউ এন ও জনাবা, শিরিন আক্তার শাহরাস্তি উপজেলা, চাঁদপুর …

vv