ব্রেকিং নিউজঃ
Home / মতামত / প্রধানমন্ত্রীর নিকট ‘নানাকে বীর মুক্তিযোদ্ধা দাবি করে নাতির আকুতি’

প্রধানমন্ত্রীর নিকট ‘নানাকে বীর মুক্তিযোদ্ধা দাবি করে নাতির আকুতি’

যুদ্ধ করে পৃথিবীতে স্বাধীন হয়েছে কয়টা দেশ? সংখ্যাটা একেবারেই বেশি নয়। তবে এর একটি যখন বাংলাদেশ, তখন বিশ্বের বুকে এ দেশটি কেন আলাদা হবে, কেন বীরের এলাকা বলে এর পরিচিতি হবে না, সেটা বলার অপেক্ষা রাখে না। সম্প্রতি বাংলাদেশের স্বাধীনতার ৪৮তম বার্ষিকী উদযাপন করছে দেশের আপামর জনতা। এতোগুলো বছর ধরে হৈ-হুল্লোরে গোটা বাঙ্গালি জাতি উদযাপন করে আসছে দিনটি মনের আনন্দে। কিন্তু আমি আনন্দিত হতে পারিনি একটা মুহূর্তের জন্যও। তীব্র চাপা কষ্ট প্রতিনিয়ত আমাকে আহত করে,কাঁদায়! আর্তনাদ করে ডুকরে কাঁদি এই দিনটি আসলেই। অতৃপ্তি বাসা বাধে স্বাধীনতার ইতিহাস বিকৃতির কারনে_প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধাদের প্রকৃত মর্যাদা দেয়া হয়নি বলে। ভুলতে পারিনা মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে আমার নানার অবদান, মানতে পারিনা কিছুতেই মুক্তিযোদ্ধার স্বীকৃতিটুকু না পেয়েই তিনি মৃত্যুর প্রহর গুনছেন। আমি একজন মুক্তিযোদ্ধার নাতি হয়েও শুধু মাত্র সঠিক মূল্যায়ন না করার জন্য মুক্তিযোদ্ধার নাতি নামক গৌরবময় উপাধিটিকে মাথার মুকুট হিসেবে ব্যবহার করতে পারি না।

কয়েকদিন আগেই উদযাপন করা হলো মহান বিজয় দিবস। বিজয়ের ভোরে সারা বাংলার মানুষ শহীদ মিনারে ফুল দিয়ে শুরু করেছিলাম পবিত্র এ দিনটি। আজন্ম এভাবেই পালন করছি শহীদ বুদ্ধিজীবি দিবস, শহীদ দিবস এবং বিজয় দিবস। নানার হাত ধরে মধ্যরাতেও শহীদমিনারে ফুল দিতে যাওয়া হতো। এভাবেই ধমনীতে, শোনিতে মিশে আছে শহীদমিনার আর শহীদ স্মৃতির প্রতি দায়িত্বশীলতা। আর তাই আজ আমি আমার নানাকে নিয়ে কিছু কথা সবার সামনে তুলে ধরতে চাই।

আব্দুল মতিন গাজী ১৯৭১ সালে স্বাধীনতা যুদ্ধে মুক্তিবাহিনীর ২ নং সেক্টরে’র বি এল এফ বাহিনীতে ১নং আঞ্চলিক অধিনায়ক শেখ ফজলুল হক মনি’র নেতৃত্বে মহান স্বাধীনতা যুদ্ধে অংশ গ্রহন করেন।
যুদ্ধকালীন কমান্ডার ছিলেন সুবেদার আব্দুর রব। তিনি তৎকালীন ২ নং সেক্টর – জহুরুল হক পাঠান সাহেবের অধীনে রাইফেল্স ও গ্রেনেট ট্রেনিং করেন।

উনার নিকট চাঁদপুর জেলা কমান্ডার মরহুম জনাব হারুনুর রশিদ স্বাক্ষরিত সার্টিফিকেট রয়েছে। তাছাড়া গেজেট প্রাপ্ত মুক্তিযোদ্ধা বর্তমান ৯নং বালিয়া ইউনিয়ন চাঁদপুর সদর শাখার সম্মানিত কমান্ডার মোবারক হোসেন তালুকদার মহোদয়ের স্বাক্ষরিত প্রত্যয়নপত্র এবং মুক্তিযোদ্ধা ইউনিয়ন তালিকার ২৫ নম্বরে আমার নানার নাম লিপিবদ্ধ রয়েছে।

দীর্ঘ নয় মাস বিভিন্ন এলাকায় যুদ্ধে সক্রিয় ভাবে অংশগ্রহণ করেন।সে সময় উনার সাথে যারা ছিলেন অনেকের নাম মুক্তিযোদ্ধার তালিকায় থাকলেও আমার নানার ( আব্দুল মতিন গাজী ) নামটি তালিকায় নেই।

স্বাধীনতার ৪৮ বছর পার হয়ে গেলো, পান নি আজও কোনও স্বীকৃতি রাষ্ট্রের কাছ থেকে। জীবন বাজী রেখে মুক্তিযোদ্ধারা যুদ্ধে গিয়েছিল দেশকে স্বাধীন করার জন্য। কোনও স্বীকৃতির জন্য যান নি। আমার নানা বঙ্গবন্ধুর আহ্বানে জীবনের মায়া ত্যাগ করে যুদ্ধ করে স্বাধীনতা ছিনিয়ে এনেছিলেন,হানাদারদের কাছ থেকে ছিনিয়ে আনা অস্ত্র জাতির পিতার আহ্বানে পায়ের সামনে বিছিয়ে দিয়ে ফিরে এসেছিলেন সাধারন জীবনে।

আমার নানা একজন প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধা। কিন্তু আজ আমাকে প্রশ্নের সম্মূখীন হতে হচ্ছে তিনি আদৌ মুক্তিযোদ্ধা ছিলেন কি না! কারন, তার সকল ডকুমেন্ট থাকা সত্যেও আজো মিলেনি প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধার স্বীকৃতি।

আমার নানা ছিলেন আত্মপ্রচার বিমূখ মানুষ। তিনি মুক্তিযুদ্ধে গিয়েছিলেন এবং মুক্তিযুদ্ধের কর্মকান্ডের সাথে জড়িত ছিলেন। আজ যখন এমন প্রশ্নের সম্মূখীন হতে হয়েছে আমার নানাকে, তাই তার নাতি হিসেবে আমি চুপ থাকতে পারিনি। কারন,এটা আমার নানার ন্যায্য অধিকার এবং নাতি হিসেবে তা প্রমান করা আমার দায়িত্ব।
আমি তাই,আমার নানাকে নিয়ে লিখা শুরু করলাম।

কয়েকদিন আগে কিছু নতুম স্বীকৃত মুক্তিযোদ্ধার নাম ঘোষনা করা হয়, পত্র পত্রিকা ঘেটে কোনো লাভ হয়নি।ওখানে নানার নাম খুজে পাইনি।

আমি হতাশ হইনি মোটেও।বরঞ্চ আরো উদ্যম সাহস শক্তি সঞ্চয় করে এগিয়ে যাওয়ার পরিকল্পনা করেছি। প্রচন্ড জেদ চাপে মনে। আমার নানা মুক্তিযোদ্ধা ছিলেন এটা আমি প্রমান করব যে ভাবেই হোক। সত্যের জয় হবে_এটাই বাস্তব।
অবশেষে- যুদ্ধকালীন নানার সাথের সহযোদ্ধাদের ( তারা গেজেট প্রাপ্ত মুক্তিযুদ্ধা ) সাথে বিভিন্ন মাধ্যমে যোগাযোগ করার পর জানতে পারলাম আমার নানা ছিলেন একজন বীর মুক্তিযোদ্ধা।

এখন সবচেয়ে বড় কষ্ট হলো-মুক্তিবার্তায় আমার নানার কোন নাম নেই।
কোনো কিছু পাওয়া-না পাওয়ার হিসাব করে নয়, দেশমাতৃকার মুক্তির জন্য ঝাঁপিয়ে পড়েছিলেন সম্মুখ সমরে। ছিনিয়ে এনেছিলেন স্বাধীনতার লাল সূর্য, একটি পতাকা, একটি মানচিত্র। স্বাধীন বাংলার মানচিত্রের জন্য নিজের জীবনের তোয়াক্কা করেননি আমার নানা। অথচ স্বাধীনতার ৪৮ বছর পেরিয়ে গেলেও তিনি পাননি কোন স্বীকৃতি।

জননেত্রী শেখ হাসিনা ক্ষমতায় আসার পর মুক্তিযোদ্ধাদের সম্মান মর্যাদা বৃদ্ধি পেয়েছে। আমার নানা আজও জীবিত। তিনি তার প্রাপ্য অধিকারের জন্য লড়াই করেই যাচ্ছেন।কিন্তু কোনো লাভ হয়নি। উনার নাম তালিকাভুক্ত করার জন্য জননেত্রী শেখ হাসিনার কাছে জোর দাবি জানাচ্ছি এই জন্য যে,আমার নানা আজও বেচে আছেন, উনার নাম তালিকা ভুক্ত করলে আমরা ( তার সন্তান, নাতি- নাতনি ) হিসেবে গৌরব বোধ করব ও সম্মানিত হবো।

মাননীয় প্রধানমন্ত্রী,
আওয়ামী লীগ তো শুধু একটা রাজনৈতিক দল নয়, পাকিস্তান থেকে বাংলাদেশ হয়ে উঠার যে গৌরবময় ইতিহাস তার অপর নাম আওয়ামী লীগ। আওয়ামী লীগ বিজয়ী হলে পুরো বাংলাদেশ বিজয়ী হয়, কিন্তু আওয়ামী লীগ হেরে গেলে যে পুরো বাংলদেশ হেরে যাবে, এতে কোন সন্দেহ নেই। আর তাই বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের অভিভাবক হিসেবে আপনার কাছে আমার বিনীত অনুরোধ আমার মুক্তিযোদ্ধা নানাকে স্বীকৃতিটুকু দিন। হয়তো নানা এই স্বীকৃতিটি পেলে স্বাধীনতার স্বাধ উপলব্ধি করে মৃত্যুর পর রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় দাপন হতে পারবেন।

মাননীয় প্রধানমন্ত্রী,
আমাদের দেশের বর্তমান প্রজন্মের জন্যে যে মহান ত্যাগ স্বীকার করেছিলেন আমার নানা- হয়তোবা তার সেই ঋণ শোধ করার ধৃষ্টতা আমরা কেউই দেখাবো না।

কিন্তু তাঁর নামটি মুক্তিযোদ্ধাদের তালিকায় তালিকাভূক্ত করে তাঁর প্রতি কিছু দায়িত্ব কি আমরা পালন করতে পারি না?
মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য এ সরকারের উদ্যোগ কম নয়। কিন্তু আলোর নিচে অন্ধকারের মত বেঁচে থেকে আমার নানা দিনের পর দিন মৃত্যুর সাথে পাঞ্জা লড়ছেন। তার এখনো আত্মতীপ্তি একটাই- জীবিত থেকে শুনে যেতে চান তিনি একজন স্বীকৃতি প্রাপ্ত মুক্তিযোদ্ধা। ইতিহাস থেকে হারিয়ে যাওয়ার আগেই আমার নানার মতো সুবিধা বঞ্চিত মুক্তিযোদ্ধাদের গেজেটভুক্ত করার পাশাপাশি সরকারি উদ্যোগে মরোণোত্ত্বর রাষ্ট্রিয় মর্যাদাসহ তাদের কবর সংরক্ষণের দাবি জানাচ্ছি।

মোঃ রবিউল হাসান (রবি), বাংলাদেশ ছাত্রলীগ, সৌদিআরব

Facebook Comments

Check Also

মাঠ নেই, চার দেয়ালে আটকে যাচ্ছে নতুন প্রজন্ম

প্রিয় চাঁদপুর রিপোর্ট : আধুনিক নগর জীবনে পার্ক ও মাঠকে বলা হয় ‘নগরের ফুসফুস’। এ হিসেবে …

vv