ব্রেকিং নিউজঃ
Home / বিশেষ প্রতিবেদন / চাঁদপুরে ঈদ ফেরত মানুষের ইলিশ আর সুস্বাধু ক্ষীর ক্রয়ে উপচে পড়া ভিড়!

চাঁদপুরে ঈদ ফেরত মানুষের ইলিশ আর সুস্বাধু ক্ষীর ক্রয়ে উপচে পড়া ভিড়!

বিশেষ প্রতিনিধি : চাঁদপুর রুপালি ইলিশের শহর হিসেবে বিখ্যাত হলেও এখন তার পাশাপাশি মতলব হয়ে উঠছে সুস্বাধু ক্ষীরে বিখ্যাত ও প্রসিদ্ব স্থান হয়ে উঠেছে চাঁদপুর জেলা শহরটি। ঈদ ফেরত মানূষদের কর্মস্থলে ফিরে যাওয়া প্রাককালে ঐতিহ্যবাহী সুস্বাধু ক্ষীর ক্রয় করতে অধির আগ্রহ দেখা যায় তাদের মধ্যে। যার ফলে ঈদের তিনদিন পরও মূখরোচক ক্ষীর ক্রয় করতে উপচে পড়া ভিড় লক্ষ্য করা গেছে।

চাঁদপুর জেলাধীন জেলার সবচাইতে উল্লেখ্যযোগ্য উপজেলা হচ্ছে মতলব, এখানে রয়েছে,বর্তমান বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর প্রধান মেজর জেনারেল আজিজ আহমেদ ও বিগত সময়ে দেশের ত্রান ও দুর্যোগ বিষয়ক মন্ত্রী মোফাজ্জল হোসেন চৌধূরী মায়া বীর বিক্রম এর জন্মস্থান।

এ ছাড়াও যুগযুগে এ মতলব ছিল প্রসিদ্ব ও উৎকৃস্ট একটি স্থানও। মতলব উপজেলা প্রশাসন সম্পাদিত মতলবের ইতিবৃত্ত গ্রন্থটিতে এই ক্ষীরের কথা উল্লেখ্য করেছেন। ২০১৩ সালে প্রকাশিত ঐ গ্রন্থটির ৪৪ নম্বর পৃষ্ঠায় বলা হয়েছে, ‘মতলবের ক্ষীর খুবই প্রসিদ্ধ ও মূখরোচক ্মিস্টান্ন জাতিয় ভাল একটি খাবার। সারা দেশে ক্ষীরের ব্যাপক চাহিদা ও কদরের কারণে একসময় অনেক হিন্দু পরিবার ক্ষীর তৈরি এবং ক্ষীরের পাত্র বানানোর কাজে ব্যস্ত থাকত। এখনো এই ঐতিহ্যবাহী দুগ্ধজাত পণ্য ক্ষীরের চাহিদা হ্রাস পায়নি বরং চাহিদা সর্বত্র পূর্বের চাইতে বেড়েছে।

মতলবের বাজার পরিদর্শনের মাধ্যমে ঐতিহ্যবাহী মিষ্টান্ন ক্ষীর সম্মন্ধে জানা যায় যে, এ ক্ষীর অনেক আগে থেকেই বাংলাদেশের প্রত্যন্ত অঞ্চল তথা দেশের বিভিন্ন জায়গায় প্রচুর পরিমাণে রপ্তানি করা হতো যা এখনও চলমান আছে। এর চাহিদা তুঙ্গে থাকায় মতলব উপজেলার বিভিন্ন এলাকা থেকে বিক্রেতারা মতলব বাজারে দুধ এনে বিক্রি করতেন আর স্থানীয় মাহাজনরা সেগুলো সংগ্রহ করতেন। ওই সময় মতলবের ঘোষপাড়া ছিল ক্ষীর, দধি ও খাঁটি ঘি তৈরির আস্তানা হিসেবে চিহিৃত বিশেষ স্থান।

এই ক্ষীর হিন্দুধর্মাবলম্বীদের বিভিন্ন পূজা-পার্বণ, ঈদ অনুষ্ঠান, বিবাহ, রাজনৈতিক অনুষ্ঠান, সামাজিকতা বা আপ্যায়নের জন্য সবখানেই নিজ গুনে সমুন্নত। মতলবের ক্ষীর সংগ্রহ করার জন্য দূর দুরান্ত থেকে অনেক মানুষ মতলবে আসে, পরমূহুর্তে তা স্ব স্ব আত্মীয় স্বজনদের বাড়ি নিয়ে যায়। রাজনীতির প্রেক্ষপটে বিশেষ উপঢৌকন হিসেবে মতলবের ক্ষীর চাঁদপুরের ইলিশের সাথে পাল্লা দিয়ে পৌঁছে যাচ্ছে দেশ বরেণ্য বিভিন্ন রাজনৈতিক দলীয় নেতাকর্মীদের বাসাবাড়িতে ও বাসভবনে।

পাঁচটি বিশেষ কারণে এখানকার ক্ষীর গুণে ও মানে সেরা। প্রথমত, গৃহস্থের কাছ থেকে সংগ্রহ করা খাঁটি দুধ দিয়ে এই ক্ষীর বানানো হয়। দ্বিতীয়ত, দুধ ও চিনি মিশ্রণের অনুপাতে কোন রকম ভেজাল মেশানো হয়না (হেরফেরকরা হয় না)। এক কেজি ক্ষীর বানাতে পাঁচ কেজি দুধ ও ৫০-৬০ গ্রাম চিনি মেশানো হয়ে থাকে। তৃতীয়ত, ক্ষীরে ময়দা বা আটা মেশানো হয় না। চতুর্থত, দুধের ননি ওঠানো হয় না। ননিসহ ক্ষীর বানানো হয়। পঞ্চমত, লাকড়ির চুলায় ক্ষীর তৈরি করা হয়,এতে করে ক্ষিরের গুনগত মান ভাল হয়ে থাকে।

মতলবের ঐতিহ্যবাহী ক্ষীর নিয়ে প্রসদ্ধ ক্ষীর ব্যবসায়ী প্রয়াত গান্ধীচরণ ঘোষের ছেলে সজল ঘোষ বলেন, আমাদের চাঁদপুরের মতলব শহর হচ্ছে ক্ষীরের জন্য একটি বিখ্যাত স্থান। আজ থেকে ৭০/৮০ বছর আগে এখানে মণে মণে ক্ষীর দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে বিক্রি করতেন আমার প্রয়াত পিতা গান্ধীচরণ ঘোষ। বিশেষ করে দেশের বাইরেও মতলবের ক্ষীরের চাহিদা ছিল ব্যাপক আকারে। এখনও এর চাহিদা অব্যাহত রয়েছে। আমি আমার বাবার আশীর্বাদে আমাদের এ দুগ্ধজাতীয় খাদ্যটির ব্যবসাটি এখনও সুনামের সাথে ধরে রাখতে পেরেছি।

আগে দুধের দামও কম ছিল, আমরা ভাল ক্ষীর তৈরি করতে পারতাম। এখন সবকিছুর দামই বেড়ে যাচ্ছে। ভালো দুধের উপর নির্ভর করে ক্ষীর তৈরি করা হলে ভাল ক্ষীরের কেজি ৪৮০-৫০০ টাকা পর্যন্ত দরে বিক্রি করতে হবে। দ্রব্যসামগ্রীর দাম সহজলভ্য না হওয়ায় মাঝে মাঝে ক্ষীরের দাম তুলনামূলক একটু বেশি থাকে। কমদামে অনেকে বিক্রি করছে,দেখছি। সে ক্ষিরের মান দাম অনুযায়ী হবে। সেটাকে ভাল ক্ষির বলা যাবেনা।

উপজেলা সদর বাজারের রূপা স্টোর সংলগ্ন আনন্দ ক্ষীর হাউসের প্রধান স্বত্তাধিকারী উৎপল ঘোষ শুধুমাত্র দধি, ক্ষীর ও ঘি বিক্রি করেন। তিনি বলেন, ব্রিটিশ আমল থেকেই উপজেলা সদরের ঘোষপাড়া এলাকার গান্ধী ঘোষের পূর্বসূরীরা ক্ষীর তৈরি শুরু করেন। খাঁটি দুধের তৈরি ও স্বাদের কারণে তখন এলাকায় এই ক্ষীরের সুনাম ছড়িয়ে পড়ে। তাদের দেখাদেখি কলাদি ও বাইশপুর গ্রামের দাসপাড়ার আরও ১৫-২০টি হিন্দু পরিবার এ কাজে লেগেযায়। বর্তমানে ঘোষপাড়ার সুনীল ঘোষ, মিলন ঘোষ, গান্ধী ঘোষ, অনিক কুমার ঘোষ, উৎপল ঘোষ, নিবাস চন্দ্র ঘোষ, উত্তম ঘোষ এবং দাসপাড়ার মাখনলাল ঘোষ, নির্মল ঘোষসহ কয়েকটি পরিবার ক্ষীরের ব্যবসা করে যাচ্ছে। তারা বলছেন, ভাল কিছু পেতে হলে ভাল দামও দিতে হবে।

পৌরসভা সংলগ্ন টিফিন কনফেকশনারীর প্রধান স্বত্তাধিকারী বাবু নিবাস চন্দ্র ঘোষ বলেন, মতলবের ক্ষীর দেশজুড়ে সমাদৃত প্রসিদ্ব। আমরা মতলবে ভেজাল বিহীন ক্ষীর তৈরি করে থাকি। ক্রেতার সন্তুষ্টি বজায় রাখাই আমাদের মূল উদ্দেশ্য। আমরা ব্যাপক সুনামের সহিত এ ক্ষীরের ব্যবসা পরিচালনা করে যাচ্ছি।

আমরা প্রথমত ক্ষীর তৈরির অর্ডার গ্রহন করি, অতঃপর তা চাহিদানুসারে ডেলিভারী করে থাকি। বর্তমানে এক কেজি দুধের দাম ৭০-৮০ টাকা,কিছু কিছু সময় দাম আরও বেশিও হয়ে থাকে। চিনিসহ অন্যান্য খরচ মিলে এক কেজি ক্ষীর বানালে খরচ পড়ে ৪০০ টাকা। প্যাকিং খরচ সহ প্রতি কেজি ভালো ক্ষীরের দাম পড়ে যায় ৪৫০ টাকা।

প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, বিক্রেতারা প্রতিদিন সকালে গৃহস্থের কাছ থেকে খাঁটি দুধ সংগ্রহ করেন। অতঃপর সংগ্রহীত দুধ বড় পাত্রে ঢেলে চুলায় একটানা দুই ঘণ্টা জ্বাল দেওয়া হয় এবং পাশাপশি তিনটি কাঠি দিয়ে পাত্রের তলদেশে বিচক্ষনতার সহিত নাড়তে থাকেন, যেন পাতিলের তলায় পোড়া না লেগে যায়। অতঃপর দুধের রং পরিবর্তন হয়ে ক্ষীরে পরিনত হয়ে আসলে তা মাটির ছোট ছোট পাত্রে আধাকেজি ও ১ কেজি পরিমাপ করে আলাদাভাবে রাখা হয়। অতঃপর বিক্রির উপযুক্ত করার জন্য পাত্রের ক্ষীর কিছুক্ষণ বাতাসে ঠান্ডা করে তার পর প্রকৃত ক্ষিরে রুপান্তর করা হয়ে থাকে।।

কয়েকজন ক্ষীর ক্রয় করতে আসা ক্রেতা জানান, “মতলবের ক্ষীর, বগুড়ার দই” না খেয়ে বুঝা যাবে না পৃথিবীতে মিস্টন্ন জাতিয় খাবারক আছে কিনা । মতলব ক্ষীরের জন্য বিখ্যাত তেমন প্রসিদ্ব একটি স্থানও বটে। আগে স্বল্পমূল্যে প্রকৃত ক্ষীর কিনতে পারা যেত এখন দাম একটু বেশি কিন্তু তারপরও এই ক্ষীরের স্বাদ ভুলা যায়না যা’ অতুলনীয় স্বাদ। এদিকে এখনও দেশের প্রত্যান্ত অঞ্চল থেকে ক্রেতারা এসে ক্ষীর কিনছেন।

খাঁটি দুধের দাম যদি কম হয়,তা’হরে স্বল্প দামে এর চাহিদা পূরন সম্ভব হতো। এ প্রসিদ্ধ খাবারটি সবার পছন্দনীয় খাবার হলেও গরীব,অসহায় ও হতদরিদ্র মানুষরা অর্থের অভাবে এ ক্ষির খেতে পারছে না। যার কারনে এ সব গরীব,অসহায় ও হতদরিদ্র মানুষরা এ খাবার খাওয়ার ইচ্ছা থাকলেও তারা এ সুস্বাধু ক্ষির খেতে না পেরে তা’থেকে বঞ্চিত হচ্ছে প্রতিদিন। এ জন্য প্রয়াত গান্ধীচরণ ঘোষের ছেলে সজল প্রতি সপ্তাহে শুক্রবার কমপক্ষে ২হাজার টাকার ক্ষির এ সব গরীব,অসহায় ও হতদরিদ্র মানুষদের মাঝে বিতরন করে থাকেন। তার কাছে ধর্মীয় কোন ভেদাভেদ নেই। যে আসবে তাকেই বিনা মূল্যে ক্ষির দিয়ে থাকেন। যা এলাকায় প্রশংসার দাবীর হয়ে আলোচনা হচ্ছে প্রয়াত গান্ধীচরণ ঘোষের ছেলে সজলকে নিয়ে।

Facebook Comments

Check Also

আওয়ামী লীগই যেকোনো দুর্যোগ সংগ্রামে নেতৃত্ব দিয়েছে : রুহুল এমপি

মনিরুল ইসলাম মনির : এডভোকেট নুরুল আমিন রুহুল বলেছেন, আওয়ামী লীগ শুধু ক্ষমতায় থেকে মানুষের …

Shares
vv