ব্রেকিং নিউজঃ
Home / মতামত / গ্যাস সংকটে গৃহিণীদের ত্রাহি অবস্থা !!!

গ্যাস সংকটে গৃহিণীদের ত্রাহি অবস্থা !!!

: মোঃ মহসিন হোসাইন : 

ছোটবেলায় বিভিন্ন নাটকে দেখেছিলাম দারিদ্র্যের কশাঘাতে জর্জরিত মানুষের বাড়িতে চুলা জ্বলত না। ক্ষুধার তাড়নায় ছোট ছোট বাচ্চারা কান্নাকাটি করত। অসহায় মানুষগুলো অপেক্ষা করতেন কবে তাদের সুদিন আসবে, কবে তাদের চুলা জ্বলবে আর নিয়মিত ভাত রান্না হবে। অবশেষে নাটকের চরিত্রের মধ্যে একজনের অর্থনৈতিক অবস্থার পরিবর্তন ঘটে। চুলায় ওঠে ভাতের হাঁড়ি। হাঁড়ি চাপিয়ে আনন্দের আতিশয্যে তিনি বলে ওঠেন, ‘জ্বল রে চুলা, জ্বল!’

বাংলাদেশের অর্থনৈতিক উন্নয়ন ঘটেছে। মাথাপিছু আয় ও ক্রয় ক্ষমতা বেড়েছে। কিন্তু দুর্ভাগ্য গৃহিণীদের পিছু ছাড়েনি। চাল-ডাল, মাছ-মাংস, আনাজপাতি নিয়ে আয়োজনের পরও তাদের চুলা জ্বলে না। তখন আনন্দে নয়, বরং কষ্টেই তাঁদের মুখ দিয়ে বেরিয়ে আসে, ‘জ্বল রে চুলা জ্বল’! কিন্তু শতবার ডাকলেও চুলা তাঁদের সেই ডাকে সাড়া দেয় না! আর দেবেইবা কী করে! গ্যাসের অভাবে চুলা যে আজ স্তব্ধ!

গ্যাসের সংকটের কারণে রান্নায় ভোগান্তির অভিজ্ঞতা সমাজের মানুষের কাছে নতুন কিছু নয়। তবে বর্তমানে যতদিন এগোচ্ছে মনে হচ্ছে ততই গ্যাসের সমস্যা বৃদ্ধি পাচ্ছে। দিনের অধিকাংশ সময় গ্যাস থাকে না। কোনো কোনো এলাকায় গ্যাসের ধারা এতটাই ক্ষীণ যে রান্না শেষ করতে স্বাভাবিকের চেয়ে তিন-চার গুণ বেশি সময় লাগছে। প্রতিনিয়ত গৃহিনীদের রান্নার পেছনে অতিরিক্ত সময় ও শ্রম দিতে হচ্ছে। সব মিলিয়ে গৃহিণীদের ত্রাহি অবস্থা। কর্মজীবী নারীদের দুর্ভোগের কথা আর না-ইবা বললাম। রাত জেগে রান্না করা, সারা দিনের কর্মব্যস্ততা, অফিস শেষে যানজটে নাকাল হয়ে ঘরে ফেরা এবং ঘরে ফিরেই চুলার ক্ষীণ তাপের সঙ্গে ধৈর্য্যরে পরীক্ষা দেওয়া সব মিলিয়ে জীবন হয়ে উঠেছে দুর্বিষহ। অন্যদিকে গ্রামে বসবাসকারী পরিবারগুলো মানবেতর দিন কাটাচ্ছে। তাদের না আছে বাইরে থেকে খাবার কিনে আনার সংগতি, না আছে অন্য কোনো পথে রান্না করার উপায়। তাই মুড়ি-চিড়া খেয়েই দিন কাটাচ্ছে তারা।

জানা গেছে, মানুষের চাহিদা বৃদ্ধি পাওয়ায় গ্যাসের সংকট প্রকট আকার ধারণ করেছে। উৎপাদন না বাড়ায় বিতরণ কোম্পানিগুলো চাহিদা অনুসারে গ্যাস দিতে পারছে না। এ ছাড়া বিদ্যুৎ উৎপাদনে বেশি গ্যাস দিতে হচ্ছে এবং পোশাক কারখানাসহ শিল্প খাতে গ্যাসের ব্যবহার বেড়েছে। তাই আবাসিক খাতে গ্যাসের সংকট ঘনীভূত হচ্ছে। যদিও আশা প্রকাশ করা হয়েছে যে তরল প্রাকৃতিক গ্যাস বা এলএনজি সরবরাহ শুরু হলে সমস্যা কমে যাবে, কিন্তু মনে হচ্ছে এই সমস্যার আশু সমাধান সম্ভব হবে না। গ্যাস-পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি হলেও এই ঘাটতি থাকবেই।

আবাসিক খাতে গ্যাসের অপচয় রোধ করে এর সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করতে গ্রাহক পর্যায়ে প্রি-পেইড মিটার স্থাপন করার কথা ছিল। পাইলট প্রকল্পের জরিপের ফলাফল সন্তোষজনক উল্লেখ করে নেতৃবৃন্দ গ্রাহকদের দায়িত্বপূর্ণ আচরণের কারণে নাকি গ্যাস সাশ্রয় হচ্ছে। জানি না, পুরো প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হতে কত সময় লাগবে বা এই ব্যবস্থায় সরকার কতটা গ্যাস সাশ্রয় করতে পারবে। কিন্তু জানতে বড় সাধ হয়, এই যে গ্যাস নিয়ে সীমাহীন দুর্ভোগ পোহানোর পরও গ্রাহকেরা নিয়মিত ক্রমবর্ধমান গ্যাসের বিল পরিশোধ করে চলেছেন, তার মোট অঙ্ক গ্রাহকের দৃষ্টিকোণ থেকে সরকার কখনো হিসাব করে দেখেছে কি না। এ ছাড়া সরকার কি কখনো ভেবেছে ইনডাকশান ওভেন, কাঠ কিংবা কেরোসিনের চুলা ক্রয় এবং ব্যবস্থাপনায় কতটা অপব্যয় হচ্ছে গ্রাহকের? বাইরে থেকে কেনা খাবারের অতিরিক্ত ব্যয় বহনে গ্রাহকের আজ হিমশিম অবস্থা! এর সঙ্গে আছে স্বাস্থ্য ঝুঁকি। এই পরিস্থিতিতে চুলায় বাস্তব গ্যাসের উপস্থিতি না থাকলেও গ্যাসট্রিকের সমস্যায় গ্রাহকদের পেট যে এক একটি গ্যাস ক্ষেত্রে পরিণত হয়েছে, সে খবর কি কেউ রেখেছে!

দ্রুত এই সমস্যার সমাধান চাই। তা সম্ভব না হলে অন্যায্য গ্যাসের বিল পরিশোধের বোঝা নামাতে হবে। সেবা না দিয়ে সেবার জন্য অর্থ গ্রহণ অনৈতিক এবং অগ্রহণযোগ্য। গ্যাসের এই ঘাটতিই যদি বাস্তবতা হয়, তবে সরকারকে বিকল্প পদ্ধতি নিয়ে ভাবতে হবে। শহরের ফ্ল্যাটবাড়িতে যেহেতু লাকড়ি বা কেরোসিনের চুলা ব্যবহার অসুবিধাজনক, তাই গ্রাহকেরা যেন স্বল্প মূল্যে ও সহজ শর্তে ইনডাকশান ওভেন কিনতে পারেন সে উদ্যোগ নেওয়া যেতে পারে। সে ক্ষেত্রে অবাধ বিদ্যুৎ প্রবাহ নিশ্চিত করতে হবে। আবার বিদ্যুৎ বিল বাড়লে তা হবে মড়ার উপর খাঁড়ার ঘা। গ্রামবাসীর জন্য রান্নার বিকল্প সুব্যবস্থা করতে হবে। মানুষ গ্যাস সংকট থেকে মুক্তি চায়।

লেখক পরিচিতি : 
লেখক ও সাংবাদিক, কেন্দ্রীয় সহ-সাধারণ সম্পাদকঃ বাংলাদেশ তৃণমূল সাংবাদিক কল্যাণ সোসাইটি।
সাধারণ সম্পাদকঃ মানবতার ডাক সামাজিক সংগঠন।
পরিচালকঃ পথের শিশুর পাঠশালা ও মানবতার ডাক একাডেমী।

Facebook Comments

Check Also

মধ্যবিত্ত্বের পিঠ দেয়ালে ঠেকে গেছে, তবুও আশায় বুক বাঁধে

® মিজানুর রহমান রানা ® ‘এ জগতে হায়, সেই বেশি চায়, আছে যার ভুরি ভুরি, …

vv