ব্রেকিং নিউজঃ
Home / মতামত / ক্ষমা কর আমাদেরকে হে করোনাভাইরাস

ক্ষমা কর আমাদেরকে হে করোনাভাইরাস

:: মোঃ রুহুল আমিন ::

২০১৯ সালের অক্টোবর মাসের গোড়ার দিকে করোনাভাইরাসের প্রাদুর্ভার শুরু হয় চীনের উহান প্রদেশ থেকে। করোনাভাইরাস শুরুর প্রাক্কালে এই মহামারী কতটা প্রাণঘাতি আকার ধারণ করবে এটা ভাবা যায়নি।

অল্পদিনের মধ্যে এই ভাইরাসটি বিশ্বের দেশে দেশে ছড়িয়ে পড়ে। আমাদের দেশে এই ভাইরাসটি ধরা পড়ে ২০২০ সালের মার্চ মাসের গোড়ার দিকে।আমি একটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে কাজ করি। এই প্রতিষ্ঠানের প্রতিষ্ঠাতা জাতীসংঘের ‘উদ্ধবাস্তু বিষয়ক হাই কমিশনে’র একজন উধ্বর্তন কর্মকর্তা হিসাবে সদ্য অবসর প্রাপ্ত। তিনি চীনের উহান প্রদেশ থেকে সৃষ্ট অতিমারী করোনাভাইরাস সম্পর্কে নিয়মিত আপডেট পাচ্ছিলেন জাতী সংঘ থেকে আর আমাদেরকে বিদ্যালয়ের শিশুদের রক্ষায় সতর্ক করছিলেন। মার্চ মাসের ৬ তারিখে আমরা শিক্ষার্থীদের নিয়ে বিদ্যালয়ের কাছাকাছি কুমিল্লার—- স্থানে শিক্ষা সফরে যাই।

বিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠাতা যথারীতি আমাদেরকে সতর্ক করে বলেছিলেন, আমরা যেন করোনাভাইরাস সম্পর্কে অধ্যয়নরত শিক্ষার্থী, শিক্ষক ও অভিভাবকদেরকে সতর্ক করার উদ্যোগ গ্রহন করি। আমরাও তাই করেছিলাম। করোনার শুরুর দিকে এই
ভাইরাসের লক্ষণ, চিকিৎসা পদ্ধতি এবং এথেকে মুক্ত থাকার উপায় সম্পর্কে কেই তেমন কিছু জানতেন না। পরবর্তীতে ধীরে ধীরে আমরাও বুঝলাম এথেকে বাঁচতে আমাদের কি কি করতে হবে।

বিদ্যালয়ের নিয়মিত পাঠদানসহ সকল কার্যক্রম নিয়ে আমরা সামনে এগিয়ে যাচ্ছি। বছরের শুরুর দিকে দেশের অধিকাংশ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের খেলা-ধুলা ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান শেষ করে পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠান শেষ করে লেখা-পড়ায় মনোনিবেশ করে।

আমরাও পড়া-লেখার পাশাপাশি খেলা-ধুলা ও সাংকৃতিক অনুষ্ঠান শেষ করে পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠান করার জন্য ১৯ মার্চ
বৃহস্পতিবার ঠিক করলাম। আমরা যথারীতি আমাদের অনুষ্ঠানে স্থানীয় গন্যমান্য ব্যক্তিবর্গদের নিমন্ত্রণের অনুষ্ঠানিকতা শেষ করি।

১৬ মার্চ সোমবার কুমিল্লা বরুড়া উপজেলার নির্বাহী কর্মকর্তাকে নিমন্ত্রণ করে আমি বিদ্যালয়ে ফিরছি। বিদ্যালয়ে ফিরার মাঝামাঝি পথেই আমার বিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠাতা ও চেয়ারম্যান আমাকে মোবাইলে একটি জরুরি মেসেজ পাঠালেন।

মেসেজে তিনি লিখেছেন ‘আপনি যেখানে যে অবস্থায় থাকুননা কেন এই মুহূর্তে বিদ্যালয়ের সকল কার্যক্রম বন্ধ করে দিয়ে শিক্ষার্থীদের বাড়ি চলে যাবার নোটিশ দিয়ে দিন। কোন প্রশ্ন করা যাবে না। পরবর্তিতে বিদ্যালয় কখন খুলবে তা মোবাইলে সকলকে জানিয়ে দেয়া হবে।’ প্রথমে মনটা একটু খারাপ হয়েছে তবে, জরুরি না হলে যে, চেয়ারম্যান মহোদয় এভাবে বিদ্যালয় বন্ধ করার নির্দেশ দিতেন না তা আমি ভালো করেই জানি ও বিশ্বাস করি। মোবাইলে আমি আমার সহকর্মীদের বিদ্যালয়ের বন্ধের নোটিশ দেয়ার কথা জানিয়ে দেই। মুহূর্তের মধ্যে বন্ধ হয়ে গেলো বিদ্যালয়। সেই মার্চ মাসের ১৭ তারিখ থেকে অদ্যাবধি
আমাদের বিদ্যালয়টি বন্ধ রয়েছে। যদিও সরকারি নির্দেশনা মোতাবেক সামাজিক দূরত্ব বজায় রেখে সীমিত পরিসরে বিদ্যালয়ে এসাইমেন্ট নেয়ার জন্য কখনো কখনো শিক্ষার্থী বা তাদের অভিভাবকগন বিদ্যালয়ে এসেছেন। করোনার কারনে দীর্ঘ এই বন্ধের মধ্যে রাস্তা-ঘাটে শিক্ষার্থী তথা তাদের অভিভাবকগনের সাথে দেখা হলে অনেকে আক্ষেপ করে বলেন, বিদ্যালয় বন্ধ থাকায় তাদের বা সন্তানের লেখা-পড়ায় অনেক ক্ষতি হয়ে গেলো। জবাবে বলি আগেতো বেঁচে থাকা তারপর লেখাপড়া। বেঁচে থাকলে লেখা-পড়া করা যাবে।

অতিমারী করোনার ফলে আমরা অনেক অকল্পনীয় নির্মম ঘটনার স্বাক্ষী হয়েছি এসময়। প্রথম দিকে বিদেশ থেকে কেউ দেশে আসলে তাকে নিজের বাড়িতে বা আত্মীয়ের বাড়িতে উঠতে দেয়া হয়নি। তাকে জোর করে যেস্থান থেকে এসেছে সেখানে পাঠিয়ে দেয়া হয়েছে। বিদেশ ফেরৎদের বাড়িতে লাল নিশান টানানো হয়েছে। এসময় আমরা দেখেছি করোনা আক্রান্ত হয়ে কোন নিকট আত্মীয় যেমন- বাবা-মা, ভাই, বোন, খালু, চাচা মারা যাওয়ার পর অনেকে ভয়ে বাড়ি ছেড়ে পালিয়েছে।

অনেক স্ত্রী-সন্তান স্বামী দাফন করার জন্য লাশ দিয়ে দিয়েছে দাফনকারি স্বেচ্ছাসেবী সংস্থাকে। নিজেরা লাশ স্পর্শ করেও দেখেননি। এসময় পুলিশ, স্থানীয় প্রশাসন, চিকিৎসক ও জনপ্রতিনিধিগন এগিয়ে এসে ভীত মানুষদের ত্রাতার ভুমিকা নিয়ে পাশে দাঁড়িয়েছেন। অবশ্য এজন্য অনেক মূল্য দিতে হয়েছে এসব সাহসী মানুষদেরকে। তাদের অনেকে করোনায় আক্রান্ত হয়ে অকালে মৃত্যুবরণ করেছেন। অফিস আদালত বন্ধ হয়ে গিয়েছে। দেশের অর্থনীতিতে পড়েছে বিশাল প্রভাব। দেশের চিকিৎসা নিয়ে অনেকে ভুয়া চিকিৎসা সনদ দেয়ার ব্যবসায় মেতে উঠেছিলো। করোনাকে পুঁজি করে অনেক অসাধু হাসপাতালের মালিক ও চিকিৎসক ধরা পড়ে এখন জেলের ঘানি টানছে। মানুষের জীবন এসময় থমকে দাঁড়িয়েছে। অনেক নিম্ন আয়ের ও খেটে খাওয়া মানুষ শহর ছেড়ে গ্রামে ফিরে এসেছে। দেশের অর্থনীতি স্থবির হয়ে পড়েছে।

তবে দেশে দেশে সরকার সহযোগিতার হাত নিয়ে মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছে। আমাদের দেশের অসহায় ও নিম্ন আয়ের মানুষের পাশে আমাদের সরকারের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী নির্দেশে প্রশাসনসহ জনপ্রতিনিধিগন দাঁড়িয়েছেন। এসময় কোথাও কোথাও ত্রাণ সামগ্রী কেউ কেউ আত্মসাৎ করেছে। অনেকে ধরা পড়ে জনপ্রতিনিধির দায়িত্ব থেকে বহিস্কৃত হয়েছেন। আবার কেউ কেউ কারাবাসে যেতে হয়েছে। নির্মমতার এসময়ে কখনো কখনো দেখা গেছে অসৎ ব্যবসায়ীরা প্রয়োজনীয় খাদ্য সামগ্রীর কৃত্তিম অভাব দেখিয়ে বাজারে নিত্য প্রয়োজনীয় সামগ্রীর মূল্য বাড়িয়ে দিয়ে অধিক মুনাফা অর্জনের পায়তারায় লিপ্ত হয়েছে। তবে সরকারের কঠোর নজরদারীর কারণে মুনাফা লোভিদের পরিকল্পনা বন্ডুল হয়ে গিয়েছে।

২০২০ সালের বছর শেষের আর একদিন বাকী। অর্থাৎ ৩০ ডিসেম্বর বুধবার পর্যন্ত বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্ংস্থার হিসাব মতে করোনাভাইরাসে সারা বিশ্বে ১৭ লক্ষ ৯৭ হাজারের বেশি মানুষ মৃত্যুবরণ করেছে। অপর দিকে করোনায় আক্রান্ত হয়েছে ৮ কোটি ২৩ লক্ষেরও অধিক মানুষ। আমাদের দেশের স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হিসাব অনুযায়ী এই একই তারিখে মোট মৃত্যুবরণ করেছে ৭৫৩১ জন মানুষ আর আক্রান্ত হয়েছে ৫১২৪৯৬ জন।

ইতিমধ্যে করোনাভাইরাস নতুন রুপে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে দেখা দিয়েছে। বাংলাদেশেও এই নতুনরুপের ভাইরাস পাওয়া গিয়েছে বলে বিভিন্ন গণমাধ্যমে খবর প্রকাশিত হয়েছে। স্বাস্থ্যবিদগণ নতুন এই রুপের করোনাভাইরাস ৭০ গুণের বেশি দ্রুত ছড়ায় বলে ইতিমধ্যে পূর্বাভাস দিয়েছেন। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বিশ্বের বিভিন্ন দেশের মানুষকে রক্ষায় নিজ নিজ দেশের সরকার প্রধানদেরকে হুঁশিয়ার করে দিয়ে বলেছেন, এই ভাইরাস থেকে মুক্ত থাকতে স্বাস্থবিধিসহ প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহন করার।

আশার কথা, ইতিমধ্যে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে করোনাভাইরাসের টিকা আবিস্কার হয়েছে। গেলো দুই সপ্তাহ পূর্বে যুক্তরাজ্যে পরিক্ষামূলকভাবে করোনাভাইরাসের টিকা দেয়া শুরু হয়েছে। আরো অনেক দেশে টিকা দেয়া শুরু হয়েছে। ২০২১ সালের জানুয়ারি মাসের প্রথম সপ্তাহে বাংলাদেশও করোনার টিকা পেতে পারে বলে আমাদের স্বাস্থ্যমন্ত্রী এক অনুষ্ঠানে জানিয়েছেন।
প্রাথমিক ভাবে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে কাদের শরীরে করোনার টিকা প্রয়োগ করা হবে তা ইতিমধ্যে সরকারিভাবে গেজেট প্রকাশিত হয়েছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তর ১৮ বছরের অধিক বয়সী ব্যক্তিরা করোনার টিকা পাবেন বলে জানিয়েছেন।

বাংলাদেশের মানুষ লড়াই-সংগ্রাম করে দেশ স্বাধীন করেছে। তারা এই করোনাকে জয়ী করতে সাহসের সাথে সামনে এগিয়ে যাচ্ছে। আমাদের বর্তমান সরকারের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা করোনার এই দূর্যোগ মোকাবিলায় তার দৃড় সিদ্ধান্তের ফলে করোনাকালিন সময়ে অসহায় মানুষজনসহ দেশের মানুষ নতুন করে বাঁচার স্বপ্ন দেখছে। আমরা আশা করছি ইংরেজী নববর্ষ’২০২১ সালের শুরুতে আমরা একটি নতুন সূর্ষ দেখতে পাবো। মানুষ খোঁজে পাবে নতুন করে বাঁচার আশা।

আমরাও বলি হে অতিমারী করোনাভাইরাস আমাদের আর কষ্ট দিও না এবার ক্ষমা কর বিশ্বের তথা বাংলাদেশের মানুষকে। আমরা স্বভাবিক জীবনে মুক্ত বাতাসে বাঁচতে চাই। পরিশেষে কবির ভাষায় বলি,‘বিপদে মোরে রক্ষা করো এ নহে মোর প্রার্থনা, বিপদে আমি না যেন করি ভয়’। ইংরেজী নতুন বছরের প্রথম দিনে আমরা একটি করোনাভাইরাস মুক্ত সূর্য দেখার অপেক্ষায় থাকলাম।

লেখক : মোঃ রুহুল আমিন,শিক্ষক ও সাংবাদিক

Facebook Comments

Check Also

চাঁদপুরে আইসোলেশনে ১ জনের মৃত্যু, করোনা উপসর্গ আরো ৬জনের

স্টাফ রিপোর্টার : চাঁদপুর সরকারি জেনারেল (সদর) হাসপাতালের আইসোলেশন ওয়ার্ডে চিকিৎসাধীন অবস্থায় করোনায় আক্রান্ত এক …

Shares
vv