ব্রেকিং নিউজঃ
Home / মতামত / কি দেখার কথা কি দেখছি!

কি দেখার কথা কি দেখছি!

একটি দেশ স্বাধীন হওয়ার শর্তাদি হলো আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত একটি নির্দিষ্ট ভূখণ্ড- ও সীমান্ত, সংশ্লিষ্ট ভূখণ্ডের অধিবাসীদের স্বাধীন থাকার ইচ্ছা ও মানসিকতা, উক্ত ভূখণ্ডে প্রতিষ্ঠিত স্বাধীন সরকার বা শাসক, উক্ত দেশের থাকবে স্বাধীন বিচার বিভাগ, প্রতিরক্ষানীতি, পররাষ্ট্রনীতি ও অর্থনীতি।

উক্ত শর্তাদি বাস্তবে পূরণ হলেই একটি দেশ স্বাধীন ও সার্বভৌম দেশ হিসেবে মর্যাদালাভ করে। পক্ষান্তরে একটি দেশের যদি শুধুমাত্র নির্দিষ্ট ভূখণ্ড থাকে কিন্তু সীমান্ত হয় অরক্ষিত, সরকার যদি হয় সাম্রাজ্যবাদী শক্তির তাঁবেদার, প্রতিরক্ষানীতি হয় পরনির্ভরশীল, পররাষ্ট্রনীতি হয় নতজানু এবং অর্থনীতি হয় ভঙ্গুর ও শোষণের শিকার তবে উক্ত দেশকে কখনও স্বাধীন-সার্বভৌম বলা যায় না।

একটি দেশের জনগণকে তখনই স্বাধীন বলা যায়, যখন উক্ত দেশের সরকার হয় স্বাধীন ও সার্বভৌম, নাগরিকদের যদি থাকে ব্যক্তি স্বাধীনতা, বাক্ স্বাধীনতা, বৈধ পথে সম্পদ অর্জন ও ব্যয়ের স্বাধীনতা, অন্ন, বস্ত্র, বাসস্থান, শিক্ষা ও চিকিৎসা পাওয়ার অধিকার, ন্যায়বিচার পাওয়ার অধিকার, সংখ্যাগরিষ্ঠের পছন্দমাফিক সরকার গঠন ও পরিবর্তনের অধিকার, মেধা ও যোগ্যতা অনুসারে চাকরি পাওয়ার ও ব্যবসা-বাণিজ্য করার অধিকার এবং ধর্মীয়, রাজনৈতিক মতামত প্রকাশ ও চর্চা করার অধিকার। দেশের নাগরিকগণ যদি উক্ত অধিকারসমূহের একটি থেকেও বঞ্চিত হয় তবে সে নাগরিক তার দেশে পরিপূর্ণ স্বাধীন তা বলা যাবে না।

মৌলিক শর্তাদির আলোকে আমরা যদি বাংলাদেশের বর্তমান অবস্থাকে পর্যালোচনা করি তবে আমরা দেখতে পাই-

ভূখণ্ড ও সীমান্ত : ১৯৪৭ সালের ভূখণ্ড ও সীমান্ত নিয়েই ১৯৭১ সালে বাংলাদেশ গঠিত হয়। ১৯৭১-পরবর্তী শাসক আমাদের বেরুবাড়ি ভারতকে প্রদান করেছে; কিন্তু বিনিময়ে প্রাপ্য আমাদের ছিটমহল ও করিডোরে আমরা এখনও সার্বভৌমত্ব অর্জন করতে পারিনি।  আমাদের সরকার প্রতিবেশী ভারতের মদদপুষ্ট শান্তিবাহিনীর নিকট দেশের এক-দশমাংশ ভূমি তুলে দেওয়ার আয়োজন করেছে। একতরফা কাঁটাতারের বেড়া দিয়ে বাংলাদেশ-ভারত যৌথ সীমান্তের নিয়ন্ত্রণ বর্তমানে ভারতের একক নিয়ন্ত্রণে চলে গেছে, আমাদের সীমান্তরক্ষী বাহিনীকে বাঘ থেকে বিড়ালের স্তরে নামিয়ে আনা হয়েছে। আমাদের ৫৪টি নদী পানির অভাবে মরা খালে পরিণত হতে চলেছে। এই হলো আমাদের ভূখণ্ড ও সীমান্তের হাল-হকিকত।

স্বাধীন থাকার ইচ্ছা ও মানসিকতা : বর্তমান সরকার সচেতনভাবে দেশের জনগণের স্বাধীন থাকার ইচ্ছা ও মানসিকতাকে ধ্বংস ও অবনমিত করার কর্মসূচি পালন করছে। স্বাধীন থাকার জন্য সাংস্কৃতিক স্বাতন্ত্র বজায় রাখা অপরিহার্য। আমাদের সরকার আমাদের নিজস্ব সংস্কৃতির বিপরীত সংস্কৃতি লালন-পালন করছে যাতে জনগণের স্বাতন্ত্রবোধ বিলুপ্ত হয়।

স্বাধীন সরকার ও শাসক : দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগণের ইচ্ছা অনুযায়ী গঠিত সরকারই স্বাধীন সরকার হওয়ার পূর্বশর্ত। সাম্রাজ্যবাদী শক্তির চাপিয়ে দেয়া সরকারকে স্বাধীন সরকার বলা হয় না; বরং তাঁবেদার সরকার বলা হয়। বর্তমান সরকারটি তথাকথিত ১/১১-এর ফসল। আর ১/১১ সংগঠিত করেছিল সাম্রাজ্যবাদী আমেরিকা, ইসরাইল, ইউরোপ ও ভারত। এমতাবস্থায় সাম্রাজ্যবাদের চাপিয়ে দেয়া সরকার স্বাধীন সরকার নয়- সরকার প্রধানও স্বাধীন শাসক নয়। তাই সাম্রাজ্যবাদের এজেন্ডা বাস্তবায়নই এ সরকারের প্রধান কাজ।

স্বাধীন বিচার বিভাগ : স্বাধীন বিচার বিভাগের পূর্বশর্ত হলো সৎ, যোগ্য, নীতিবান ও নিরপেক্ষ আইনমন্ত্রী ও বিচারক। বাংলাদেশের বর্তমান বিচার বিভাগে দলীয় ক্যাডার, খুনের আসামি ও প্রধান বিচারপতির এজলাসে লাথি মারার দায়ে দোষী ব্যক্তিকে পর্যন্ত বিচারক নিয়োগ করে বিচার বিভাগকে পক্ষপাতদুষ্ট ও চরম বিতর্কিত করেছে। ফলে বর্তমানে বিচার বিভাগ নৈরাজ্য সৃষ্টিতে ও অবিচার করার ব্যাপারে সম্পূর্ণ স্বাধীনতা ভোগ করছে।

প্রতিরক্ষানীতি : আমাদের প্রতিরক্ষা সামর্থ্যকে বিগত সাড়ে তিন বছরে সর্বনিম্ন পর্যায়ে নামিয়ে আনা হয়েছে। দলীয়করণ, আত্মীয়করণ, গোপালগঞ্জীকরণ ও ষড়যন্ত্রের মাধ্যমে প্রতিরক্ষা বাহিনীর সৎ, যোগ্য, মেধাবী ও দেশপ্রেমিক কর্মকর্তাদেরকে হত্যা, নির্যাতন, বরখাস্ত ও চাকরিচ্যুত করে বিশ্বমানের এ বাহিনীকে পর্যুদস্ত করা হয়েছে। প্রতিরক্ষা ক্রয়ের ব্যাপারে সম্ভাব্য প্রতিপক্ষের উপর নির্ভরশীলতা আমাদের ভবিষ্যৎ প্রতিরক্ষা সামর্থ্যকে হুমকির মুখে ঠেলে দেয়া হয়েছে।

পররাষ্ট্রনীতি : আধুনিক সরকারে প্রেসিডেন্ট বা প্রধানমন্ত্রীর পর যে গুরুত্বপূর্ণ পদ রয়েছে সেটি হলো পররাষ্ট্রমন্ত্রী। বর্তমান সরকার পররাষ্ট্র বিষয়ে সম্পূর্ণ অনভিজ্ঞ ব্যক্তিকে পররাষ্ট্রমন্ত্রী করেছে, বিদেশের বাংলাদেশ মিশনগুলোতে অযোগ্য, দুর্নীতিবাজ ও অনভিজ্ঞ ব্যক্তিদের পদায়ন করে বহির্বিশ্বে বাংলাদেশের স্বার্থকে জলাঞ্জলী দিয়েছে। একদেশ নির্ভর পররাষ্ট্রনীতির কারণে বিশ্বব্যাপী বাংলাদেশ বন্ধুহীন হয়ে পড়েছে। বিপদের দিনে বন্ধুহীন ব্যক্তির ক্ষেত্রে যা হয় বাংলাদেশের বেলায়ও তাই হবে।

অর্থনীতি : সাম্রাজ্যবাদী শক্তি তার টার্গেটকৃত দেশের অর্থনীতি ধ্বংসকে প্রধান কর্তব্যকর্ম হিসেবে নির্ধারণ করে। দেশ ও জনগণ যদি অর্থনৈতিকভাবে শক্তিশালী থাকে তবে তারা সাম্রাজ্যবাদী আগ্রাসন মোকাবেলায় দৃঢ় অবস্থান নেয়। অপরদিকে ভুখা-নাঙ্গা জনগণ সামান্য খুঁদ-কুড়ার লোভে সাম্রাজ্যবাদের নিকট আত্মসমর্পণ করে। এ জন্যই অতীতে আমরা দেখেছি ১৭৫৭ সালের ২৩ জুনের পলাশী ষড়যন্ত্রের মাত্র ১৯ বছরে সমৃদ্ধ বাংলাকে দুর্ভিক্ষের বাংলায় পরিণত করে এক-তৃতীয়াংশ জনগণকে মৃত্যুর মুখে ঠেলে দেয়া হয়েছিল, ১৯৭১ সাল-পরবর্তী তিন বছরে বাংলাদেশে দুর্ভিক্ষ সৃষ্টি করে লাখ লাখ মানুষকে মৃত্যুর মুখে ঠেলে দেয়া হয়েছিল।আমাদেরকে বার বার দুর্ভিক্ষের মুখে ঠেলে দিয়ে আসলেই লাভবান হচ্ছে কারা?এই প্রশ্নের উত্তরে কেউ যদি বলে বন্ধুপ্রতীম দেশ।তাঁর উত্তরই সঠিক যথার্থ মেনে নিতে হবে যৌক্তিকভাবে।উদাহরণ হিসেবে বলা যেতে পারে রিজার্ভ লুটের নেপথ্যের কাহিনী।এদেশের অর্থনীতির ভীত নাড়িয়ে দিলে কার লাভ কার ক্ষতি সেটা এখন জলের মত পরিস্কার।এই হলো স্বাধীন দেশের হালহকিকত…।

দেশের এই চলমান নৈরাজ্যকর পরিস্থিতি কোনো ভাবেই মেনে নেয়া যায় না । একটি দেশের যদি শুধুমাত্র নির্দিষ্ট ভূখণ্ড থাকে কিন্তু সীমান্ত হয় অরক্ষিত, সরকার যদি হয় সাম্রাজ্যবাদী শক্তির তাঁবেদার, প্রতিরক্ষানীতি হয় পরনির্ভরশীল, পররাষ্ট্রনীতি হয় নতজানু এবং অর্থনীতি হয় ভঙ্গুর ও শোষণের শিকার তবে উক্ত দেশকে কখনও স্বাধীন-সার্বভৌম বলা যায় না।এই পরিস্থিতিতে মানুষ বেঁচে আছে ‘ছেড়ে দে মা কেঁদে বাঁচি’ অবস্থায়।যা কখনো প্রত্যাশিত ছিলো না।

আমরা কি এমন বাংলাদেশ চেয়েছিলাম?

বেলায়েত সুমন

লেখক পরিচিত : সাংবাদিক, অনলাইন অ্যাক্টিভিস্ট।

Facebook Comments

Check Also

স্মৃতিতে শিক্ষক কবির মজুমদার

রোটারিয়ান মোঃ জাহাঙ্গীর আলম হৃদয় :  যখন পড়বেনা মোর পায়ের চিহ্ন এই বাটে আমি বাইবোনা,আমি …

vv