ব্রেকিং নিউজঃ
Home / শীর্ষ / কাল বৈশাখীর হানা : নদী তীরবর্তী চার উপজেলায় ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি

কাল বৈশাখীর হানা : নদী তীরবর্তী চার উপজেলায় ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি

লন্ড-ভন্ড হয়েছে শতাধিক ঘরবাড়ি, দোকান ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠান * ফসল ও বিদ্যুতের ব্যাপক ক্ষতি * আহত অর্ধ শত

কাল বৈশাখীর ঝড় আকস্মিক হানা দিয়েছে চাঁদপুরে। ঝড়ের তা-বে নদী তীরবর্তী চারটি উপজেলায় ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। উপজেলা চারটি হচ্ছে : চাঁদপুর সদর, হাইমচর, মতলব উত্তর ও দক্ষিণ। এ চার উপজেলায় মানুষের বসতঘর, গোয়ালঘর, দোকান, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানসহ শতাধিক ঘরবাড়ির চালা উড়ে গিয়ে ল-ভ- হয়ে গেছে। এছাড়া বিদ্যুতের খুঁটি, তার, গাছের ডালা ভেঙ্গে উড়িয়ে নিয়ে গেছে। ফসলী জমিরও ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। ঝড়ের কবলে পড়ে প্রায় অর্ধশত নারী-পুরুষ আহত হয়েছে। এদের অনেককে হাসপাতালে ভর্তি করতে হয়েছে। গতকাল সোমবার ভোর আনুমানিক সাড়ে ৬টা থেকে ৭টার মধ্যে আকস্মিকভাবে এই কাল বৈশাখীর ঝড় আঘাত হানে। সবচেয়ে বেশি ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে চাঁদপুর সদর ও মতলব উত্তর উপজেলায়। ক্ষতিগ্রস্ত এলাকাগুলোতে গতকাল রাত পর্যন্ত বিদ্যুৎ সংযোগ দেয়া সম্ভব হয়নি।

সদর উপজেলার প্রত্যন্ত চরাঞ্চল রাজরাজেশ্বর ইউনিয়নে কাল বৈশাখীর তান্ডবে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। এ ইউনিয়নের প্রায় ১২টি বসতঘরের চালা উড়ে গিয়ে লন্ডভন্ড হয়ে গেছে। একটি মসজিদও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এছাড়া ধান, মরিচসহ ফসলের ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। রাজরাজেশ্বর ইউপি চেয়ারম্যান হাজী হযরত আলী বেপারী জানান, ইউনিয়নের ১নং ওয়ার্ডে ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। এ ওয়ার্ডের চিরারচর গ্রামের রশিদ প্রধানিয়ার তিনটি চৌচালা ও একটি দোচালা ঘর, হারুন আসামীর ২টি বসতঘর, প্রধানীয়া বাড়ি জামে মসজিদ, সানাউল্লাহ প্রধানিয়ার ২টি বসতঘর এবং খোরশেদ মোল্লা, সুফিয়া বেগম, মোস্তফা বকাউল ও সুরুজ মিয়া ঢালীর ১টি করে বসতঘর ল-ভ- হয়ে গেছে। ধান, মরিচসহ অন্য ফসলের ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। হযরত আলী বেপারী জানান, তিনি এলাকায় গিয়ে ক্ষতিগ্রস্তদেরকে নিজস্ব তহবিল থেকে ৩৫ হাজার টাকা তাৎক্ষণিক নগদ সহায়তা দেন।

এছাড়া সদর উপজেলার আশিকাটি ইউনিয়নের বেশ ক’টি গ্রামে কাল বৈশাখী ঝড়ে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। মাদ্রাসা মার্কেট, মুরগির ফার্মসহ বেশ ক’টি প্রতিষ্ঠানের চাল উড়ে গেছে। ফসলী জমি, বিদ্যুতের খুঁটি, গাছের ডালপালা ভেঙ্গে বসতঘরে পড়ে ক্ষতি হয়েছে।

সরজমিনে গিয়ে দেখা যায়, মতলব দক্ষিণ উপজেলা সদর ও চাঁদপুর সদর উপজেলার আশিকাটি ইউনিয়নের মধ্য রালদিয়াসহ বেশ ক’টি গ্রামে হঠাৎ কাল বৈশাখীর তা-বে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। মতলব দক্ষিণ উপজেলার মুন্সীরহাট, বহরী ও দিঘলদী এলাকায় গাছপালা ভেঙ্গে বিদ্যুতের তার ছিড়ে যায়। চাঁদপুর সদর উপজেলার ময়দানখোলা এলাকায় রাস্তায় কড়ই গাছ ভেঙ্গে পড়ে। এতে প্রায় ২ ঘণ্টা সড়কে যানচলাচল বন্ধ থাকে। এছাড়া একই এলাকার মাদ্রাসা মার্কেট ও মুরগির ফার্মের চাল উড়ে গেছে। মুনির বেপারীর মুদি দোকান ও আসবাবপত্রসহ তিন লক্ষাধিক টাকা, হোসেন গাজীর ঘর ও আসবাবপত্রসহ ১ লক্ষাধিক টাকা, আঃ খালেক তপাদারের ২টি মুদি দোকান, সিরাজ খানের ঘরসহ আসবাবপত্র লক্ষাধিক টাকা, আঃ কাদির গাজীর টিনশেড বিল্ডিংসহ ৫ লক্ষাধিক টাকা, মিনু গাজীর ঘর, গাছপালা ও আসবাপত্র, দেলোয়ার হোসেন খানের ঘর, পাকের ঘর, জুলফু খানের বসতঘর ও আসাবাবপত্র, আকবর খানের মুরগির খামার, কামাল গাজীর বসতঘর ও আসবাবপত্র, ইউসুফ গাজীর বসতঘরসহ লক্ষাধিক টাকা, ইসমাইল গাজীর বসতঘর, ফজলুল হক খানের টিনশেড বিল্ডিং, আসবাবপত্র, দোকানসহ দুই লক্ষাধিক টাকা, মিজান খানের বসতঘর আসবাবপত্রসহ দেড় লক্ষাধিক টাকার মালামাল ঝড়ে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোকে দেখতে যান আশিকাটি ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান বিল্লাল মাস্টার। গতকাল সকাল থেকে মতলব দক্ষিণের মুন্সীরহাট এলাকা, চাঁদপুর সদর উপজেলার আশিকাটি ইউনিয়নে ৬নং ওয়ার্ডের মধ্য রালদিয়া এলাকায় বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন রয়েছে। সদর উপজেলার ইসমাইল হোসেন, ফজলুল হক, মিজান, জহির, মিনু গাজী, কামাল গাজীসহ উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় প্রায় ৩০ ব্যক্তি আহত হয়েছে। তবে গুরুতর আহতের খবর পাওয়া যায় নি।

পল্লী বিদ্যুতের মতলব জোনাল অফিসের ডিজিএম মোঃ মনির হোসেন বলেন, কাল বৈশাখী ঝড়ে এ উপজেলার মুন্সীরহাট, বহরী, বাড্ডা ও দিঘলদী এলাকায় গাছ ও গাছের ডালা ভেঙ্গে বিদ্যুতের তার ছিড়ে গেছে। এগুলো সংস্কার করার কাজ চলছে।

মতলব দক্ষিণ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা শহিদুল ইসলাম বলেন, হঠাৎ কাল বৈশাখী ঝড়ো বাতাসে গাছপালা ভেঙ্গে গেছে। কিন্তু জনজীবনসহ এ উপজেলায় তেমন কোনো ক্ষয়ক্ষতি হয় নি।

এদিকে কাল বৈশাখীর ছোবলে ল-ভ- হয়ে গেছে মতলব উত্তর উপজেলার এখলাছপুর চরাঞ্চলের আলী আহমদ মিয়া মাধ্যমিক বিদ্যালয়সহ অর্ধ শতাধিক ঘরবাড়ি, গাছপালা ও ফসলের মাঠ। উপজেলার অধিকাংশ এলাকায় গতকাল রাত পর্যন্ত বিদ্যুৎ সংযোগ বন্ধ রয়েছে।

উপজেলার উত্তর সর্দারকান্দি, দক্ষিণ সর্দারকান্দি, শাখারীপাড়া, চরকাশিম, বোরোচর, বাহেরচর, চরউমেদ, চর জহিরাবাদ, চরকাশিম মুরাদ মিয়ার বাজার, এখলাছপুর আশ্রয়ন প্রকল্প ও বেড়িবাঁধ এলাকায় খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, এসব এলাকার অনেকের বসতঘর ভেঙ্গে গেছে এবং গোয়ালঘর, দোকানপাট, জমির কাঁচা-পাকা ইরি-বোরো ধান, আখ, মরিচ ও তিল ক্ষেতেরও ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। এছাড়া উপজেলার বিভিন্ন গ্রাম ও বাজারের ছোট-বড় অর্ধ শতাধিক ঘরবাড়ি ও দোকান লন্ডভন্ড হয়ে গেছে। গাছপালা ভেঙ্গে সড়কের অনেক স্থানে যান চলাচল ব্যাহত হচ্ছে।

চরকাশিম বোরোচরের বারেক বকাউল, নূর বকাউল, জাহাঙ্গীর আলম, মাঈন উদ্দিন মোল্লা, মান্নান হাওলাদার, জসিম গাজী, ফখরুল বকাউল, ওহাব মিজি, অলু প্রধানিয়া ও রিপন বেপারী; সর্দারকান্দি গ্রামের নজির প্রধান, রুবেল রানা, আক্তার হোসেন, মোসলেম বেপারী, আলমাস প্রধান, হাজেরা বেগম, নূর বানু, নূর ইসলাম, ফারুক বেপারী, আশরাফ আলী, আরজ আলী, আবুল কালাম বেপারী, আবুল ফকির, নূরজাহান, দেলোয়ার হোসেন, আলী হোসেনসহ আরো অনেকের বসতঘর ভেঙ্গে গেছে।

চরকাশিম গ্রামের কৃষক মোঃ নেয়ামত উল্লাহ জানান, সোমবার সকাল ৭টার দিকে হঠাৎ কাল বৈশাখী ঝড়ে স্কুল ভবন, দোকানপাট, বসতঘর, গাছপালা ও ফসলের ব্যাপক ক্ষতি হয়।

ফরাজীকান্দি ইউপি সদস্য মাহবুব আলম মিস্টার সর্দারকান্দির ক্ষতিগ্রস্ত এলাকা পরিদর্শন করে বলেন, এ গ্রামসহ আশপাশের কয়েক গ্রামের উপর দিয়ে বয়ে যাওয়া ঝড়ে ঘরবাড়ি, গাছপালা ও ফসলের ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। ক্ষতিগ্রস্থ পরিবারের সহযোগিতার জন্যে সরকারের দৃষ্টি আকর্ষণ করছি।

উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মোঃ সালাউদ্দিন জানান, ঝড়ে ইরি ধান, ভুট্টা, আখ ও তিল ক্ষেতের বেশি ক্ষতি হয়েছে।

সোমবার সকাল আনুমানিক ৭টায় কাল বৈশাখী হাইমচরেও আঘাত হানে। ঝড়ে বড় বড় গাছপালা ভেঙ্গে ঘর বাড়ি, দোকানপাটসহ ফসলের ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। এছাড়া বিদ্যুৎ লাইনেরও ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। ঝড়ের কবলে পড়ে ৫ জন আহত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে।

উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় খোঁজ নিয়ে জানা যায়, প্রায় ৩০ মিনিটের কাল বৈশাখী ঝড়ে হাইমচরের ছোট লক্ষ্মীপুরের খাদিজা বেগমের মাথায় গাছের ডাল পড়ে তিনি মারাত্মকভাবে আহত হন। তাকে হাইমচর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স এ ভর্তি করা হয়। এছাড়া গন্ডামারার আলাউদ্দিন, নয়ানির রিঙ্াচালক জাকির ও আমির হোসেন একইভাবে আহত হয়ে প্রাথমিক চিকিৎসা নেন। গাছপালা উপড়ে পড়ে কাটাখালী, কলেজ রোড, নয়ানি ও ভিঙ্গুলিয়ায় বিদ্যুতের তার ছিড়ে বিদ্যুতের ব্যাপক ক্ষতি হয়।

এছাড়া গাছ উপড়ে পড়ে তেলির মোড়ের ব্যবসায়ী হারুন পাটওয়ারী ও শিক্ষক বিধান চন্দ্রের বসতঘর ভেঙ্গে তাদের প্রায় ৫ লাখ টাকার ক্ষতি হয়েছে বলে জানা গেছে। এ সংবাদ পেয়ে হাইমচর উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান নূর হোসেন পাটওয়ারী ও উপজেলা নির্বাহী অফিসার আবু হাসনাত মোঃ মঈনউদ্দিন ক্ষতিগ্রস্ত এলাকা পরিদর্শন করে তাদেরকে সার্বিক সহযোগিতার আশ্বাস দিয়েছেন।

প্রতিবেদন: চাঁদপুর, হাইমচর, মতলব উঃ ও মতলব দক্ষিণ প্রতিনিধি

Facebook Comments

Check Also

ফরিদগঞ্জে নিখোঁজের ৪দিন পর মানসিক ভারসাম্যহীন বৃদ্ধের লাশ উদ্ধার

এস.এম ইকবাল : ফরিদগঞ্জে নিখোঁজ হওয়ার ৪দিন পর নুরুল হুদা (৬০) নামে এক মানসিক ভারসাম্যহীন ব্যক্তির …

vv