ব্রেকিং নিউজঃ
Home / সাহিত্য / একুশ একটি বিপ্লবী চেতনার নাম
লেখক: বেলায়েত সুমন

একুশ একটি বিপ্লবী চেতনার নাম

® বেলায়েত সুমন পাটওয়ারী


একুশে ফেব্রুয়ারি বাঙালি জাতীয় চেতনার স্বর্ণোজ্জ্বল মাইলফলক হিসেবে কালের গণ্ডি পেরিয়ে এখনও দীপ্যমান। এ দিন বুকের তাজা রক্ত ঢেলে মাতৃভাষাকে বিশ্বের কাছে সমুন্নত রাখার এক মরণজয়ী সংগ্রাম গৌরবান্বিত করে রেখেছে আমাদের ইতিহাসকে।মূলত: এখান থেকেই আমাদের জাতীয় ইতিহাসের এক নবতর অধ্যায়ের সূচনা। আপন অস্তিত্বকে জানার এবং উপলব্দি করার নানান উপাদানে ভরপুর সে অধ্যায়।

৫২’র ভাষা আন্দোলন কোনো একটি নির্দিষ্ট দিন কিংবা নির্দিষ্ট সময়ের ফসল নয়। সুদীর্ঘ একটা কাল পরিক্রমার ঔপনিবেশিক শাষন- শোষনের এক বিশেষ পরিনতি মাত্র। একটা অনিবার্য ও ঐতিহাসিক পরিবর্তনের মুখে ক্ষয়িষ্ণু ঔপনিবেশিক এবং ঘুনেধরা আমলাতান্ত্রিক কাঠামোর মধ্য দিয়ে তদানীন্তন যে পাকিস্তান রাষ্ট্রের সৃষ্টি হয়েছিল চরিত্র ও বৈশিষ্ট্যগত দিক থেকে তার কর্ণধাররা ছিল উগ্র প্রতিক্রিয়াশীল চরিত্রের।

প্রায় ১২’শ মাইলের ব্যবধানে দুই অংশে গড়া পাকিস্তান রাষ্ট্রটির মূল কর্ণধাররা শুরু থেকে ছিলেন পশ্চিমাংশের বাসিন্দা। এদেশের ভাষা উর্দু।অপরদিকে রাষ্ট্রের সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগণ অধ্যুষিত পূর্বাংশের ভাষা বাংলা। রাষ্ট্রভাষার প্রশ্নে পাকিস্তান রাষ্ট্রের প্রতিক্রিয়াশীল খলনায়কদের যে উলঙ্গ মানষিকতার অবশ্যম্ভাবী বহি:প্রকাশ ঘটেছিল তারই বিপরীতে উচ্চারিত হয়েছিল ভাষা ভিত্তিক প্রবল জাতীয় চেতনায় উদ্দীপ্ত বাঙালি তরুনদের অপ্রতিরোধ্য প্রতিবাদ।

১৯৫২ থেকে’ ২০১৭। মাঝখানে পেরিয়ে গেছে দীর্ঘ ৬৫বছর। এই সুদীর্ঘ সময়ের ব্যবধানে সেদিনের সেই রক্তক্ষয়ী সংগ্রামে যারা মহাসৈনিকের ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছিলেন তাদের অনেককেই আমরা হারিয়েছি।প্রতিবছরই একুশে ফেব্রুয়ারির উষালগ্নে সেইসব সূর্যসৈনিকদের আমরা শ্রদ্ধাবনতচিত্তে স্বরণ করি।

মূলত: ভাষা আন্দোলন শুরু হয়েছিলো তথাকথিত পাকিস্তান রাষ্ট্রের খলনায়কদের হীন ষড়যন্ত্রের মধ্য দিয়ে। ১৯৪৮ সালে তদানীন্তন পাকিস্তানের প্রথম গভর্ণর জেনারেল মুহাম্মদ আলী জিন্নাহ্ ঢাকার বুকে দাঁড়িয়ে ঘোষণা করে গেলেন, “Urdu and Urdu alone,shall be the state language of Pakistan” অর্থাৎ কেবল মাত্র উর্দুই হবে পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা। সেদিন বাঙালি জাতি তাঁর এই অযোক্তিক ঘোষণা মেনে নিতে পারেনি। পাকিস্তানের বৃহত্তম জনগোষ্ঠির ভাষা বাংলা তাই বাংলাকে বাদ দিয়ে উর্দু একমাত্র রাষ্ট্রভাষা হতে পারেনা। বলিষ্ট ও অকাট্য যুক্তির অবতারণা করে শানিত লেখনির মাধ্যমে প্রতিবাদ জানালেন জ্ঞানতাপস ডক্টর মুহম্মদ শহীদুল্লাহ। মাতৃভাষার মর্য্যাদা রক্ষার সংগ্রাম মূলত: এখান থেকেই শুরু এর চূড়ান্ত অভিব্যক্তি ঘটে ১৯৫২ সালের একুশে ফেব্রুয়ারি এক রক্তাক্ত বিস্ফোরণের মাধ্যমে।

পাকিস্তান সৃষ্টির পর থেকেই পশ্চিমা শাষকগোষ্ঠি তৎকালীন পূর্ব বাংলার জনগনের প্রতি বিমাতাসুলভ আচরণ করতে শুরু করে। ধর্মভিত্তিক ভ্রাতৃত্বের বন্ধন সুদৃঢ় করার পরিবর্তে নানান রকম ষড়যন্ত্র করতে শুরু করে। ১৯৪৮ সালে অনুষ্ঠিত গণপরিষদের প্রথম অধিবেশনে বাংলায় বক্তৃতা করার অনুমতি দিতে অস্বীকার করায় পশ্চিমা শাষকগোষ্ঠির আসল চেহারা প্রকাশ হয়ে যায়। এ ঘটনা তৎকালীন পূর্ববাংলার জনগণের মধ্যে তীব্র ক্ষোভের সঞ্চার করে। প্রবলভাবে রুখে দাঁড়ায় এদেশের প্রতিবাদী ছাত্র জনতা। সদ্য প্রতিষ্ঠিত পাকিস্তান নামক রাষ্ট্রের মাধ্যমে এ অঞ্চলের মানুষের প্রত্যাশা কতটা পূরণ হতে পারে তা উপলব্ধি করতে দেরি হলো না ছাত্র জনতা সহ সর্বস্তরের মানুষের ।

আজ ভাষা আন্দোলনের ৬৫বছর এবং স্বাধীনতা যুদ্ধের ৪৫বছর পর ভ্রষ্ট রাজনীতির খেলায় সুপরিকল্পিত ভাবে স্বার্থান্বেষী কুচক্রি মহল “৭১’এর নরঘাতক” নামে পরিচিত সেই হিংস্র দানবদেরকে এদেশের মানুষের কাছে জায়েজ করার অপপ্রয়াস চালাচ্ছে। ৫২’র ভাষা আন্দোলনে চরম বিশ্বাসঘাতকতা করেও এই গোষ্ঠি থেমে থাকেনি। পাকিস্তানি শাষকচক্রের সেবাদাস এই গোষ্ঠিই ৭১’ এ -৩০ লাখ বাঙালির প্রাণসংহার করেছে। দেশে রাজনৈতিক বিভ্রান্তি সৃষ্টি করে সেই গোষ্ঠিই আজ রাজনীতির ক্ষেত্রে শক্ত শেকড় গেড়ে বসে আছে। শিক্ষাঙ্গন সহ দেশের সকল গুরুত্বপূর্ণ অবস্থানে অনুপ্রবেশ করে ৫২ ও ৭১’র চেতনার বিরুদ্ধে অবিরাম চক্রান্তের জাল বিস্তার করে চলেছে। নতুন প্রজন্মের কাছে বিকৃত ইতিহাস উপস্থাপন করে বাঙালির ইতিহাস ঐতিহ্যকে লণ্ডভণ্ড করে দেয়ার পায়তার অব্যাহত রেখেছে। এই তৎপরতা মহান ভাষা আন্দোলন ও স্বাধীনতা যুদ্ধের গৌরবময় ইতিহাসকে হাস্যকর করে তোলার অপ:প্রয়াস ছাড়া আর কিছুই নয়। এই অপচেষ্টা প্রতিহত করতে হবে নতুন প্রজন্মের কাছে ভাষা আন্দোলনের সঠিক ইতিহাস তুলে ধরার মাধ্যমে। বাঙালি জাতিকে বিভ্রান্ত করার সকল পথ অবশ্যই বন্ধ করতে হবে যাতে ৩০ লাখ শহীদের রক্তে ভেজা পবিত্র এই মাটিতে ঐসব নরঘাতক পশুদের তা-ব নৃত্য আর দেখতে না হয়।

মহান ভাষা আন্দোলনকে আন্দোলনে জীবন দেয়া মানুষকে শ্রদ্ধা জানাতে প্রতি বছর ফেব্রুয়ারি মাস এলেই আমরা কেবলই সোচ্চার হয়ে উঠি সর্বস্তরে বাংলা ভাষা চালু করার জন্য। একুশে ফেব্রুয়ারি পার হলে আবার সব ভুলে যাই। ভুলে যাই একুশের শহীদদের কাছে দেয়া আমাদের অঙ্গীকার। আজও সর্বস্তরে বাংলা চালু করা সম্ভব হয়নি।বরং জাতীয় জীবনের সর্বক্ষেত্রে অপসংস্কৃতির জোয়ারে বাঙালি স্বত্ত্বার বিলুপ্তির প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে বহু আগেই। একুশের স্মৃতি মুছে দেয়ার জন্য ৫২’র বিশ্বাসঘাতকরা আজো জাতীয় শহীদ মিনার সহ দেশের বিভিন্ন শহীদ মিনারে অবমাননা করার ধৃষ্টতা দেখাতে সাহস পাচ্ছে। এবারের শহীদ দিবসে তাই কাম্য হবে আমাদের নতুন শপথ নেবার। এবারের একুশের লাল সূর্যকে বরণ করতে হবে আগামী দিনের সাহসী সংগ্রামের প্রত্যয়ে।


♦লেখক :সাংবাদিক,ব্লগার- https://www.facebook.com/belayet.sumon.14

Facebook Comments

Check Also

রক্তের টান

—————–সজীব খান—————— সকাল বেলা ঔষুধের জন্য বাজারে গিয়ে প্রয়োজনীয় ঔষুধ ক্রয় করে, কিছু সরকারি ঔষুধের …

vv